দিল্লির বাতাসেই বিষ! ৪৩% শিশুর ফুসফুস অকেজো হওয়ার পথে, দীপাবলির আগে সুপ্রিম কোর্টের কড়া হুঁশিয়ারি!

রাজধানী দিল্লির মারাত্মক বায়ুদূষণের থাবা এবার সরাসরি গিয়ে পড়েছে শিশুদের স্বাস্থ্যের ওপর। বিষাক্ত ধোঁয়া ও দূষণের কারণে দিল্লির ৪৩ শতাংশেরও বেশি স্কুলপড়ুয়ার ফুসফুসের ক্ষমতা স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক কমে গিয়েছে। দীপাবলির মরসুমে বাজি থেকে হওয়া দূষণ রোধ করা কেবল আদালতের নির্দেশ বা পুলিশের পাহারা দিয়ে সম্ভব নয় উল্লেখ করে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করল সুপ্রিম কোর্ট।

সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্তের নেতৃত্বাধীন তিন বিচারপতির বেঞ্চ স্পষ্ট জানিয়েছে, বাজি মুক্ত দীপাবলিকে সাধারণ মানুষের নিজেদের সামাজিক অভিযানে পরিণত করতে হবে। সরকার ও স্থানীয় পুরসভাকে কাউন্সিলরদের মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে সচেতন করার আহ্বান জানিয়েছে আদালত।

দিল্লির ৪৩.৫% শিশুর ফুসফুসের কার্যক্ষমতা হ্রাস
কেন্দ্রীয় দূষণ নিয়ন্ত্রণ বোর্ড বা সিপিসিবি (CPCB)-র একটি সমীক্ষায় উঠে এসেছে এক আতঙ্কজনক চিত্র। ৯ থেকে ১৭ বছর বয়সী মোট ৫,৬৭১ জন দিল্লির শিশু এবং অন্যান্য অঞ্চলের ২,২৪৫ জন শিশুর ফুসফুস পরীক্ষা করে দেখা যায়:

ফুসফুসের ক্ষমতা: দিল্লির ৪৩.৫% শিশুর ফুসফুসের কার্যক্ষমতা সাধারণের চেয়ে কম পাওয়া গেছে। অন্যান্য এলাকার ক্ষেত্রে এই হার ২৫.৭%।

শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যা: দিল্লির ২০.৩% শিশু শ্বাস নেওয়ার সমস্যায় ভুগছে, ১৩.৬% শিশুর শ্বাসনালীর জটিলতা রয়েছে এবং ৯.৬% শিশু উভয় ধরনের শারীরিক সমস্যায় আক্রান্ত।

মেয়েদের অবস্থা চরম আশঙ্কাজনক: সমীক্ষা অনুযায়ী দিল্লির ৫১% বালিকা এবং ৩৯.৮% বালকের ফুসফুসের ক্ষমতা স্বাভাবিকের তুলনায় কম।

ঋতুভিত্তিক প্রভাব: বর্ষাকালে দিল্লির ৩৯.৯% শিশুর ফুসফুসের কার্যক্ষমতায় ঘাটতি দেখা গেলেও শীত ও গ্রীষ্মকালে তা একলাফে বেড়ে ৫২.৭%-এ গিয়ে পৌঁছোয়।

নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও কেন কমছে না দূষণ?
দিল্লি-এনসিআরে (Delhi-NCR) বাজি বিক্রির ওপর বারংবার নিষেধাজ্ঞা জারি করা হলেও কাজের কাজ কিছুই হয়নি। ২০১৮ সালে শীর্ষ আদালত সাধারণ বাজির ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়ে কেবল ‘গ্রিন বাজি’ বা সবুজ বাজিতে অনুমতি দেয়।

সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্ট পর্যবেক্ষণ করে দেখেছে যে, সম্পূর্ণ বাজি নিষিদ্ধ করার পরেও বায়ুগুণমান সূচকে (AQI) বড় কোনো পরিবর্তন দেখা যায়নি। তবে আদালত এও জানিয়েছে যে বাজি নিশ্চিতভাবেই দূষণ ছড়ায়, কিন্তু কেবল সরকারি আদেশ জারি করে এর সমাধান সম্ভব নয়।

গ্রিন বাজি কি সম্পূর্ণ নিরাপদ?
বিজ্ঞানী ও গবেষণা সংস্থা CSIR-NEERI দূষণ কমাতে ‘গ্রিন বাজি’ তৈরি করেছে। এর দ্বারা বাতাসে সূক্ষ্ম ধূলিকণা বা পার্টিকুলেট ম্যাটার নির্গমন অন্তত ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমানো সম্ভব।

তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে জানিয়েছেন, গ্রিন বাজি মানেই সম্পূর্ণ দূষণমুক্ত নয়। এগুলি থেকেও ক্ষতিকর রাসায়নিক উপাদান বাতাসে মেশে। তাই এগুলির ব্যবহারও নির্দিষ্ট নিয়ম ও নির্ধারিত সময় মেনেই হওয়া উচিত।

ব্যবসায়ীদের চালাকি ও নজরদারির অভাব
আদালতের শুনানির সময় উঠে এসেছে আরও এক চাঞ্চল্যকর সত্য। অমিকার কিউরি অপরাজিতা সিংহ জানান, অনেক বাজি বিক্রেতাই দোকানের সামনে ‘গ্রিন বাজি’-র বাক্স সাজিয়ে রেখে ভেতরে গোপনে সাধারণ বিষাক্ত বাজি বিক্রি করছেন।

ফলে কেবল দোকান পরিদর্শন বা কাগজের নির্দেশে এই অসাধু চক্র বন্ধ করা যাচ্ছে না। সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছে যে, স্থানীয় প্রশাসন, পুলিশ এবং অন্যান্য এজেন্সির মধ্যে জোরালো সমন্বয় রেখে বাজির উৎপাদন থেকে বিক্রি—সব ক্ষেত্রেই কড়া পর্যবেক্ষণ চালাতে হবে।

কেবল বাজিই নয়, কাঠগড়ায় আরও অনেক কিছু
দিল্লিতে দূষণের সমস্যা কেবল দীপাবলি বা বাজির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। শীতকালে এই পরিস্থিতি আরও জটিল রূপ ধারণ করে। যানবাহনের কালো ধোঁয়া, কলকারখানার বর্জ্য, নির্মাণকাজের উড়ন্ত ধূলিকণা, আবর্জনা পোড়ানো এবং পার্শ্ববর্তী রাজ্যগুলিতে খড় (পরালি) পোড়ানোর ধোঁয়া যৌথভাবে দিল্লির আকাশকে বিষাক্ত করে তুলেছে।

সুপ্রিম কোর্টের মতে, জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ এবং সমস্ত স্তরের সমন্বিত প্রচেষ্টা ছাড়া দিল্লির ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে এই বিষাক্ত বাতাসের হাত থেকে রক্ষা করা অসম্ভব।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *