নিঝুম রাতে চেনা গলার ডাকে সাড়া দিলেই সর্বনাশ! বাংলার এই ১০ রহস্যময় ভূতের কাণ্ড জানলে শিউরে উঠবেন!

বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণের তালিকায় অত্যন্ত রোমাঞ্চকর এবং ঐতিহ্যমণ্ডিত একটি রাত হলো ভূত চতুর্দশী। দীপাবলি বা কালীপুজোর আগের দিন কার্তিক কৃষ্ণপক্ষের চতুর্দশী তিথিতে পালিত হয় এই বিশেষ উৎসব। এই দিনে চৌদ্দ শাক খাওয়া এবং সন্ধ্যার সময় ঘর জুড়ে চৌদ্দটি প্রদীপ জ্বালানোর প্রাচীন প্রথা রয়েছে। মূলত অশুভ শক্তি ও অতৃপ্ত আত্মাদের দূরে সরিয়ে গৃহের মঙ্গল কাম এবং পূর্বপুরুষদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতেই গ্রাম বাংলায় এখনও এই রীতি নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করা হয়।

তবে এই বিশেষ দিনটিকে ঘিরে বাংলার লোক সংস্কৃতিতে নানা ধরনের ভূত ও অলৌকিক সত্তার গল্প যুগ যুগ ধরে প্রচলিত রয়েছে। চলুন, ভূত চতুর্দশীর এই রাতে জেনে নেওয়া যাক বাংলার লোককথায় বিখ্যাত এমন ১০টি ভূতের কথা।

১. ব্রহ্মদৈত্য
লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, ব্রাহ্মণ বর্ণের কোনো ব্যক্তির অস্বাভাবিক বা অপমৃত্যু হলে তিনি ব্রহ্মদৈত্যে পরিণত হন। এদের পরনে সাধারণত ধুতি এবং কাঁধে পৈতে থাকে। অন্যান্য ভূতের মতো এরা মানুষের ক্ষতি করে না, বরং শান্ত প্রকৃতির হয়। সাধারণত বেলগাছ বা বটগাছে এদের বাস বলে মনে করা হয় এবং বিপদে পড়া মানুষকে এরা অনেক সময় সাহায্যও করে।

২. পেত্নী ও শাঁখচুন্নি
পেত্নী: অবিবাহিত অবস্থায় বা কোনো অপূর্ণ ইচ্ছা নিয়ে কোনো নারীর মৃত্যু হলে তিনি পেত্নীতে পরিণত হন। এদের পা দুটি পিছনের দিকে ঘোরানো থাকে এবং স্বভাব অত্যন্ত বদমেজাজি হয়।

শাঁখচুন্নি: বিবাহিত হিন্দু নারীর অপমৃত্যু হলে শাঁখচুন্নি হয়। এদের পরনে লাল পাড়ের শাড়ি ও হাতে শাঁখা থাকে। লোককথা অনুযায়ী, এরা মূলত বিবাহিত নারীদের ওপর ভর করে বা সুখী সংসারে অশান্তি সৃষ্টির চেষ্টা চালায়।

৩. মেছো ভূত
নাম থেকেই স্পষ্ট যে এই ভূতের প্রধান দুর্বলতা হলো মাছ। পুকুর, বিল কিংবা বড় জলাশয়ের ধারেই এদের আস্তানা। রাতের বেলা কেউ জলাশয় থেকে মাছ ধরে বাড়ি ফিরলে এরা তার পিছু নেয় এবং ভয় দেখিয়ে মাছ ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। অনেক সময় মানুষের গলা নকল করে এরা বলে ওঠে— “আমাকে একটু মাছ দিবি না?”

৪. গেছো ভূত
যেসব ভূত গাছপালায় বসবাস করে, তাদের সামগ্রিকভাবে গেছো ভূত বলা হয়। তেঁতুল গাছ, পুরনো বটগাছ, শেওড়া গাছ বা ঘন বাঁশঝাড় এদের প্রিয় আস্তানা। গভীর রাতে গাছের ডালপালা নাড়িয়ে বা পথচারীদের লক্ষ্য করে হঠাৎ ঢিল ছুঁড়ে এরা ভয় দেখাতে ও আনন্দ পেতে ভালোবাসে।

৫. মামদো ভূত
লোককথা অনুযায়ী, মুসলিম সম্প্রদায়ের কোনো ব্যক্তির অপমৃত্যু হলে তিনি মামদো ভূতে পরিণত হন। এদের শরীর লম্বাটে এবং রূপ বেশ ভয়ংকর হয়। এদের পায়ের পাতাও পেছনের দিকে ঘোরানো থাকে। কবরস্থান বা নিস্তব্ধ নির্জন এলাকায় এদের উপদ্রব বেশি দেখা যায় এবং এরা মানুষকে ঘাড় মটকানোর ভয় দেখায়।

৬. নিশি
নিশি হলো গ্রামবাংলার লোকসংস্কৃতির সবচেয়ে ভয়ংকর ও ছলনাময়ী এক অপচ্ছায়া। গভীর রাতে এরা মানুষের পরিচিত গলা (যেমন—মা, বাবা বা কোনো কাছের মানুষের কণ্ঠস্বর) হুবহু নকল করে নাম ধরে ডাকে। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, নিশির ডাকে সাড়া দিয়ে দরজা খুলে বাইরে বের হলে মানুষ সম্মোহিত হয়ে তার পিছন পিছন চলে যায় এবং চিরতরে হারিয়ে যায়। লোকমুখে প্রচলিত রয়েছে যে নিশি কখনো তিনবারের বেশি ডাকে না, তাই রাতে তিনবার ডাক শোনার পর কখনোই দরজা খুলতে নেই।

৭. বেঘো ভূত ও কানাবুলা
বেঘো ভূত: সুন্দরবন বা জঙ্গলসংলগ্ন এলাকায় বাঘের আক্রমণে যাঁদের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়, তাঁরা বেঘো ভূতে পরিণত হন। এরা মানুষকে ভুল পথে চালিত করে গভীর জঙ্গল বা বাঘের ডেরার দিকে নিয়ে যায়।

কানাবুলা বা ভুলো ভূত: এরা পথচারীদের চেনা রাস্তা গুলিয়ে দেয়। একই রাস্তায় মানুষকে সারা রাত চক্কর কাটিয়ে হয়রান করাই এদের মূল কাজ।

৮. আলেয়া
জলাভূমি বা ধানখেতের ওপর রাতের অন্ধকারে যে রহস্যময় আলো জ্বলতে ও নিভতে দেখা যায়, তাকেই গ্রামবাংলার মানুষ ‘আলেয়া’ বলে চেনে। এই আলো দেখে অনেক সময় জেলেরাও পথচারীরা বিভ্রান্ত হয়ে গভীর জলাভূমিতে নেমে পড়েন এবং মর্মান্তিক মৃত্যুর শিকার হন। (যদিও বিজ্ঞানসম্মতভাবে পচনশীল জৈব পদার্থ থেকে তৈরি মিথেন গ্যাসের কারণে এই আলোর সৃষ্টি হয় বলে প্রমাণিত)।

৯. স্কন্ধকাটা
ভয়ংকর রেল দুর্ঘটনা বা অন্য কোনো কারণে যাঁদের মাথা শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, তাঁরা স্কন্ধকাটা ভূতে পরিণত হন। এদের কাঁধের ওপর মাথা থাকে না, বরং বুক বা পেটের মাঝখানে চোখ থাকে। এরা রাতের নির্জন রাস্তায় নিজেদের হারানো মাথা খুঁজে বেড়ায় এবং পথচারীদের ওপর চড়াও হয়।

১০. ডাইনি ও চুড়েল
ডাইনি: এরা জীবিত নারী হলেও সমাজের একটি অন্ধবিশ্বাসে এদের মধ্যে অলৌকিক ও অশুভ ক্ষমতা রয়েছে বলে মনে করা হয়। এরা মূলত তন্ত্রসাধনা ও নানা কুপ্রথার সঙ্গে যুক্ত থাকে।

চুড়েল: গর্ভাবস্থায় বা সন্তান প্রসবের সময় কোনো নারীর মৃত্যু হলে তিনি চুড়েলে পরিণত হন। এদের রূপ অত্যন্ত কুৎসিত ও ভয়ংকর প্রকৃতির হয়।

(বিশেষ দ্রষ্টব্য: এই প্রতিবেদনটি শুধুমাত্র লোকসংস্কৃতি, প্রচলিত বিশ্বাস ও মিথের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। এর কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই এবং অন্ধবিশ্বাস ছড়ানো এর মূল উদ্দেশ্য নয়।)

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *