“প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবি থেকে গোপন চিঠি!” এসআইআর বিতর্কে মুখ খুলল নির্বাচন কমিশন

নির্বাচন কমিশনের অন্দরে এসআইআর (SIR) প্রক্রিয়া এবং অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত গ্রহণকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া রাজনৈতিক চাঞ্চল্য ও মতবিরোধের জেরে অবশেষে মুখ খুলল কমিশন। তীব্র বিতর্ক এবং গুঞ্জনের মাঝেই সম্প্রতি দিল্লির সদর দফতরে এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে বসেছিল কমিশনের ফুল বেঞ্চ। সেই বৈঠকের পরই প্রকাশিত এক বিশদ বিবৃতির মাধ্যমে বিতর্কিত বিভিন্ন বিষয়ে নিজেদের অবস্থান অত্যন্ত স্পষ্ট করল নির্বাচন কমিশন (Election Commission of India)।
কী জানাল নির্বাচন কমিশন?
নয়াদিল্লিতে কমিশনের সদর দফতরে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার এবং দুই নির্বাচন কমিশনার এস এস সান্ধু ও বিবেক জোশী। বৈঠক শেষে প্রকাশিত বিবৃতিতে এসআইআর-এর নীতিগত সিদ্ধান্ত, ভোটার তালিকায় নাম তোলার ফর্ম, ইসিআইনেট (ECINet) পোর্টাল এবং ক্যাবিনেট সচিবকে পাঠানো বিতর্কিত চিঠি সংক্রান্ত সমস্ত প্রশ্নের বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে।
মূল বিতর্কের সূত্রপাত হয়েছিল সম্প্রতি একটি সর্বভারতীয় সংবাদমাধ্যমের তদন্তমূলক প্রতিবেদনকে কেন্দ্র করে। ওই প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছিল যে, গত ১০ মাসে এসআইআর সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়ে দুই নির্বাচন কমিশনার অন্তত ১৪ বার আপত্তি জানিয়েছিলেন। এই রিপোর্ট প্রকাশ্যে আসার পরেই কমিশনের অন্দরে সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন ওঠে এবং বিরোধী শিবির-সহ বিভিন্ন মহল থেকে মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবিও জোরালো হতে শুরু করে।
মতবিরোধের জল্পনা উড়িয়ে কমিশনের সাফাই
এই উত্তাল পরিস্থিতিতে কমিশনের প্রকাশিত বক্তব্য অনুযায়ী, এসআইআর প্রক্রিয়া নিয়ে তিন নির্বাচন কমিশনারের মধ্যে মূলত কোনো চূড়ান্ত বা নীতিগত মতবিরোধ ঘটেনি। যে সিদ্ধান্তগুলি এতদিন নেওয়া হয়েছে, সেগুলি যৌথ ও সর্বসম্মতভাবে অনুমোদিত হয়েছে বলেই দাবি করা হয়েছে। কমিশনের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ২৪ জুন বিহার থেকে শুরু করে পশ্চিমবঙ্গ-সহ দেশের ৩০টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে এসআইআর সংক্রান্ত নির্দেশিকা জারির ক্ষেত্রে তিন সদস্যেরই পূর্ণ সম্মতি ছিল।
পরবর্তী পর্যায়ের সূচি সম্পর্কেও একই দাবি করে কমিশন জানিয়েছে, ১২টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের জন্য এসআইআর-এর সূচি ২০২৫ সালের ২৭ অক্টোবর এবং আরও ১৯টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের জন্য ২০২৬ সালের ১৪ মে প্রকাশ করা হয়েছিল। এই প্রতিটি ক্ষেত্রেই কমিশনের পূর্ণাঙ্গ ও সর্বসম্মত অনুমোদন ছিল।
ক্যাবিনেট সচিবকে পাঠানো চিঠির আসল রহস্য
এরপরেই সামনে আসে ক্যাবিনেট সচিবকে কমিশনের তরফে পাঠানো একটি গোপন চিঠির প্রসঙ্গ। অভিযোগ উঠেছিল, দুই নির্বাচন কমিশনার ওই চিঠির মাধ্যমে কমিশনের সামগ্রিক কাজ পরিচালনার পদ্ধতি নিয়ে তীব্র আপত্তি জানিয়েছিলেন এবং সংখ্যাগরিষ্ঠের মতকে গুরুত্ব না দেওয়ার গুরুতর অভিযোগও তুলেছিলেন। একটি স্বাধীন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হওয়া সত্ত্বেও কেন অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক বিষয় ক্যাবিনেট সচিবের কাছে পাঠানো হলো, তা নিয়ে জোরালো প্রশ্ন তৈরি হয়েছিল।
এই অভিযোগের স্পষ্ট ব্যাখ্যা দিয়ে কমিশন জানিয়েছে, ওই চিঠিটির সঙ্গে এসআইআর কিংবা নির্বাচন কমিশনের নীতিগত কোনো সিদ্ধান্তের বিন্দুমাত্র সম্পর্ক ছিল না। মূল বিষয়টি ছিল ডেপুটেশনে কর্মরত এক আধিকারিকের দায়িত্ব পালনের ধরন এবং তাঁর কাজ সংক্রান্ত কিছু নির্দিষ্ট প্রশাসনিক জটিলতা। কমিশনের দাবি, দুই নির্বাচন কমিশনারের স্পষ্ট নির্দেশ থাকার পরেও সংশ্লিষ্ট আধিকারিকের জারি করা কাজের পুনর্বণ্টনের নির্দেশ কার্যকর করা হয়নি। মূলত সেই প্রশাসনিক অসঙ্গতির ব্যাপারটিই চিঠির মাধ্যমে জানানো হয়েছিল।
আইটি বিভাগ ও পোর্টাল নিয়ে বড় সিদ্ধান্ত
পাশাপাশি, আইটি (IT) বিভাগের দায়িত্ব এবং ইসিআইনেট পোর্টাল নিয়ে তৈরি হওয়া ধোঁয়াশাও দূর করার চেষ্টা করেছে কমিশন। তাদের স্পষ্ট বক্তব্য, ডেপুটি নির্বাচন কমিশনারের কাছ থেকে আইটি বিভাগ দেখভালের দায়িত্ব কখনও কেড়ে নেওয়া হয়নি। এছাড়া ফর্ম ৬-এর ব্যবহার প্রসঙ্গে কমিশন জানিয়েছে, এসআইআর চলাকালীন ওই নির্দিষ্ট ঘোষণাপত্র ব্যবহারের বিষয়টি সুপ্রিম কোর্ট বহাল রেখেছে। তবে এসআইআর-এর বাইরের স্বাভাবিক সময়ে ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে ‘Registration of Electors Rules, 1960’ অনুযায়ী নির্ধারিত প্রচলিত নিয়ম ও ফর্মই কার্যকর থাকবে।
কমিশনের ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম বা ইসিআইনেট পোর্টালের কার্যকারিতা, আধিকারিকদের প্রবেশাধিকার এবং তথ্য সুরক্ষার পদ্ধতি নিয়েও বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছিল। সমস্ত বিতর্কের অবসান ঘটাতে গোটা ব্যবস্থাটি নতুন করে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে খতিয়ে দেখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কমিশন। এর জন্য একজন সিনিয়র ডেপুটি নির্বাচন কমিশনারের নেতৃত্বে একটি বিশেষ কমিটি গঠনের কথাও ঘোষণা করা হয়েছে। সবমিলিয়ে, নানা মহলের সমালোচনার মুখে পড়ে বিবৃতির মাধ্যমে নিজেদের স্বচ্ছতা প্রমাণ করার চেষ্টা চালাল নির্বাচন কমিশন।