“সন্ত্রাসবাদের শেকড় উপড়ে ফেলতে বড় আঘাত হানতে প্রস্তুত ভারত!” এনডিটিভি সামিটে রাজনাথ সিংয়ের হুঙ্কারে কাঁপছে প্রতিবেশী দেশ?

জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে ভারত সরকার যে বিন্দুমাত্র আপস করতে নারাজ, এনডিটিভি ডিফেন্স সামিট ২০২৬-এর মঞ্চ থেকে সেই বার্তাটি ফের দ্ব্যর্থহীন ভাষায় স্পষ্ট করে দিলেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং। রবিবার আয়োজিত এই গুরুত্বপূর্ণ সামিটে প্রতিরক্ষামন্ত্রী দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে জানান, প্রতিবেশী দেশ যতক্ষণ পর্যন্ত এপার বাংলায় সন্ত্রাসবাদ ছড়ানোর অপচেষ্টা চালিয়ে যাবে, ঠিক ততক্ষণই সন্ত্রাসবাদীদের নির্মূল করতে যে কোনো কঠিন আঘাত হানতে পুরোপুরি প্রস্তুত রয়েছে ভারত।
এদিন দেশের অবস্থান স্পষ্ট করে রাজনাথ সিং বলেন, ভারত বরাবরই শান্তিতে বিশ্বাসী একটি দেশ এবং অন্য কোনো দেশের ভূখণ্ড জবরদখল করার বা কারোর প্রতি আগ্রাসী মনোভাব দেখানোর কোনো মানসিকতা ভারতের নেই। তবে একই সঙ্গে তাঁর জোরালো সতর্কবার্তা, ভারতের এই শান্তির ইচ্ছাকে যেন কোনোভাবেই দুর্বলতা বলে ভুল না করা হয়। প্রতিরক্ষামন্ত্রীর ভাষায়, “ভারত শান্তিতে বিশ্বাসী, আমরা যুদ্ধ চাই না। ভারত অন্য কোনো ভূখণ্ড দখল করতে চায় না, কাউকে হুমকিও দিতে চায় না। কিন্তু নীরবতা আর দুর্বলতার মধ্যে আকাশ-পাতাল পার্থক্য রয়েছে।” তিনি আরও যোগ করেন, যতক্ষণ না প্রতিবেশী দেশ সীমান্তপারের সন্ত্রাসবাদ বন্ধ করছে, ভারত নিজের নিরাপত্তার স্বার্থে সন্ত্রাসবাদীদের দমনে সর্বাত্মক আক্রমণ চালাতে এক মুহূর্ত পিছপা হবে না।
চিপ থেকে অস্ত্র, দেশীয় উৎপাদনে সর্বোচ্চ জোর
প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে ভারতের দীর্ঘমেয়াদি আত্মনির্ভরতার ওপর বিশেষ জোর দেন রাজনাথ সিং। তাঁর স্পষ্ট বক্তব্য, একটি দেশের প্রকৃত নিরাপত্তা বহুলাংশে নির্ভর করে তার নিজস্ব উৎপাদন ক্ষমতার ওপর। তাই চিপ, ছোট স্ক্রু থেকে শুরু করে বিশালাকার যুদ্ধজাহাজ এবং পূর্ণাঙ্গ আধুনিক অস্ত্র ব্যবস্থা—প্রতিরক্ষা উৎপাদনের প্রতিটি স্তরে দেশের নিজস্ব সক্ষমতা বহুগুণ বাড়িয়ে তুলতে হবে।
সরকারের ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ দর্শনের মূল ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে তিনি বলেন, “যা এখানেই দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি করা সম্ভব, তা কেন আমরা বাইরে থেকে আমদানি করতে যাব?” প্রতিরক্ষামন্ত্রীর মতে, দেশীয় উৎপাদন বাড়ানোর এই নিরলস প্রচেষ্টাই ভারতকে কৌশলগত স্বনির্ভরতার চরম শিখরে পৌঁছে দিতে পারে।
ভবিষ্যতের যুদ্ধ হবে প্রযুক্তিনির্ভর ও বহুমুখী
আগামী দিনে দেশের নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জগুলির সফল মোকাবিলার জন্য প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় বেশ কিছু যুগান্তকারী ও কাঠামোগত সংস্কার সাধন করা হয়েছে বলে জানান রাজনাথ। তাঁর মতে, সরকার কেবল বর্তমানের তাৎক্ষণিক প্রয়োজন মেটানোর মধ্যেই নিজেদের সীমাবদ্ধ রাখেনি, বরং ভবিষ্যতের যেকোনো কঠিন পরিস্থিতির কথা মাথায় রেখেই প্রতিরক্ষা প্রস্তুতিকে অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
টেলিকম সেক্টরে অতীতে ২জি থেকে সরাসরি ৫জি-তে উত্তরণের উদাহরণ টেনে তিনি বোঝান যে, আধুনিক যুগে যুদ্ধের ধরনও অত্যন্ত দ্রুত বদলাচ্ছে। বর্তমানে বিশ্বজুড়ে ‘পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধ’ বা ফিফথ জেনারেশন ওয়ারফেয়ার নিয়ে আলোচনা চলছে। রাজনাথের কথানুযায়ী, ভারত একই সঙ্গে কন্ট্যাক্ট ও নন-কন্ট্যাক্ট এবং কাইনেটিক ও নন-কাইনেটিক—এই সমস্ত বহুমুখী যুদ্ধের মুখোমুখি হওয়ার জন্য নিজেদের সামরিক ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বহুগুণ বাড়িয়ে চলেছে। পাশাপাশি, দেশের নিজস্ব কোয়ান্টাম প্রযুক্তির উন্নয়নেও সমান গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে এবং এই সংক্রান্ত নীতিগত পরিকাঠামোকে আরও শক্তিশালী করা হয়েছে।
‘মাল্টি-ডোমেইন’ যুদ্ধের জন্য সর্বাত্মক প্রস্তুতি
ভবিষ্যতের যুদ্ধ যে শুধুমাত্র সাধারণ স্থলযুদ্ধ বা জলযুদ্ধে সীমাবদ্ধ থাকবে না, সে কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে প্রতিরক্ষামন্ত্রী জানান যে আগামী দিনের যুদ্ধ মূলত ‘মাল্টি-ডোমেইন’ বা বহুমাত্রিক ক্ষেত্রে পরিচালিত হবে। স্থল, জল, আকাশ ছাড়াও মহাকাশ, সাইবার স্পেস এবং তথ্যক্ষেত্র—এই সমস্ত ডোমেইনে প্রযুক্তির ব্যবহার দ্রুত প্রসার লাভ করবে।
এই প্রসঙ্গে রাজনাথ বলেন, “আধুনিক যুগের একজন সৈনিক কেবল সাধারণ যোদ্ধা নন; তাঁরা অত্যন্ত বহুমুখী কর্মক্ষেত্রের পরিবেশে নিজেদের দায়িত্ব পালন করেন। ভবিষ্যতের যুদ্ধক্ষেত্র পুরোপুরি প্রযুক্তি-চালিত হতে চলেছে। প্রযুক্তির দিক থেকে যে দেশ সব দিক থেকে এগিয়ে থাকবে, যুদ্ধক্ষেত্রের ফলও তাদের পক্ষেই যাবে।” পরিবর্তিত যুদ্ধকৌশল এবং যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ভারতের প্রতিরক্ষা পরিকাঠামোকে ক্রমাগত আরও আধুনিক ও শাণিত করে তোলা হচ্ছে বলেই জানিয়েছেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী।