৩৫ বছর বন্ধ ছিল চোয়াল! কলকাতায় রূপকথার মতো অস্ত্রোপচারের পর মুখ খুলেই প্রথম কী খেলেন আফগান যুবক?

চিকিৎসা বিজ্ঞানের যুগে অসম্ভব বলে সত্যিই কিছু নেই, তা আরও একবার প্রমাণ করে দেখাল তিলোত্তমা কলকাতার চিকিৎসকরা। দীর্ঘ সাড়ে তিন দশক ধরে মুখ প্রায় খুলতেই পারতেন না এক আফগান যুবক। ছোটবেলায় চোয়ালে এক জটিল ও মারাত্মক সমস্যা দেখা দেওয়ার কারণে তাঁর চোয়ালের জোড়ের সঙ্গে মাথার খুলির হাড় সম্পূর্ণভাবে জুড়ে গিয়েছিল। যার জেরে জীবনের প্রথম থেকেই কোনোদিন স্বাভাবিকভাবে খাবার খাওয়ার সুযোগ পাননি তিনি। দশকের পর দশক ধরে শুধুমাত্র তরল খাবারের ওপর নির্ভর করেই বেঁচে থাকতে হয়েছিল তাঁকে। অবশেষে ৩৬ বছর বয়সে সুদূর আফগানিস্তান থেকে কলকাতায় এসে এক জটিল অস্ত্রোপচারের পর নতুন জীবন ফিরে পেলেন আহমেদ খান।

চিকিৎসকদের সূত্রে জানা গেছে, আহমেদের এই বিরল ও অত্যন্ত জটিল সমস্যাটিকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় ‘কমপ্লিট বোনি টেম্পোরোম্যান্ডিবুলার জয়েন্ট অ্যানকাইলোসিস’ (Complete Bony Temporomandibular Joint Ankylosis) বলা হয়। দীর্ঘদিন মুখ বন্ধ থাকার কারণে শুধু খাবার খাওয়া নয়, কথা বলা, মুখের পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং জীবনের সাধারণ আনন্দগুলি উপভোগ করার ক্ষেত্রেও তীব্র সমস্যার মুখোমুখি হতে হতো তাঁকে। এর আগে অন্য কোনো এক হাসপাতালে তাঁর অস্ত্রোপচার করা হলেও তাতে চোয়ালের স্বাভাবিক নড়াচড়া ফেরেনি। শেষ পর্যন্ত অন্ধের যষ্টির মতো চিকিৎসার আশায় এক বন্ধুর হাত ধরে কলকাতায় পা রাখেন আহমেদ।

এখানে আসার পর বিশিষ্ট চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে তাঁর সিটি স্ক্যান ও অন্যান্য পরীক্ষা করা হলে সমস্যার গভীরতা স্পষ্ট হয়। চিকিৎসকরা দেখতে পান, চোয়ালের জোড় এবং সংলগ্ন খুলির অংশটি কার্যত একটি কঠিন হাড়ের কাঠামোয় পরিণত হয়েছে। মুখ একেবারেই খুলতে না পারায় অ্যানাস্থেশিয়া দিয়ে শ্বাসনালীতে নল ঢোকানো অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। তাই অত্যন্ত নিখুঁত ও ব্রঙ্কোস্কোপিক পদ্ধতিতে শ্বাসনালী সুরক্ষিত করে প্রায় ছয় ঘণ্টার দীর্ঘ এক জটিল অস্ত্রোপচার শুরু হয়। খুলির সঙ্গে জুড়ে যাওয়া সেই শক্ত হাড়ের অংশ অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে কেটে বাদ দিয়ে চোয়ালের স্বাভাবিক নড়াচড়ার জন্য প্রয়োজনীয় জায়গা তৈরি করা হয়। এমনকি হাড় যাতে ভবিষ্যতে ফের পরস্পরের সঙ্গে জুড়ে না যায়, তার জন্য ‘টেম্পোরালিস মাসল ফ্ল্যাপ’-এর মতো আধুনিক পদ্ধতিও প্রয়োগ করা হয়।

সফল অস্ত্রোপচারের পর চিকিৎসকদের প্রাথমিক লক্ষ্য ছিল শুধু মুখ খোলার পরিধি বাড়ানো নয়, বরং চোয়ালের স্বাভাবিক কার্যকর নড়াচড়া ফিরিয়ে আনা। দীর্ঘ এক মাস পর ফলোআপের জন্য যখন আহমেদ আবার চিকিৎসকদের কাছে আসেন, তখন তাঁর মুখ প্রায় ৩৫ মিলিমিটার পর্যন্ত খুলতে শুরু করেছে, যা প্রায় তিন আঙুলের সমান। চিকিৎসকদের পরামর্শ মেনে তরল খাবারের গণ্ডী পেরিয়ে তিনি এখন নিয়মিত স্বাভাবিক খাবার খেতে পারছেন। আর সবকিছুর মধ্যে সবচেয়ে আবেগের মুহূর্তটি ছিল অস্ত্রোপচারের পর তাঁর নিজের মুখে রসগোল্লা তুলে খাওয়ার অভিজ্ঞতা। সাড়ে তিন দশক ধরে অন্ধকারের ঘেরাটোপে থাকা একটি জীবনকে আলোর পথ দেখানোর এই অভাবনীয় সাফল্য আবারও বিশ্বমঞ্চে কলকাতার চিকিৎসকদের মুকুটে নতুন এক উজ্জ্বল feathers যোগ করল।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *