ছোট স্তন মানেই কম দুধ তৈরি হয়? স্তন্যপান নিয়ে এই ৫টি প্রচলিত মিথ এক নিমেষে ভাঙলেন বিশেষজ্ঞরা!

নতুন মা হওয়ার পর মাতৃত্বের আনন্দের পাশাপাশি যে জিনিসটি সবচেয়ে বেশি ধন্দ তৈরি করে, তা হলো অজস্র অহেতুক পরামর্শ। স্তন ঝুলে যাওয়া থেকে শুরু করে ছোট স্তনে পর্যাপ্ত দুধ না হওয়া—এমন বহু ভুল ধারণায় জর্জরিত হন নতুন মায়েরা। অথচ এই সময়ে তাঁদের প্রয়োজন সঠিক তথ্য এবং মানসিক সমর্থন। সম্প্রতি ‘নিউজ নাইন লাইভ’-এর মুখোমুখি হয়ে পুনের মাদারহুড হসপিটালের ল্যাকটেশন কনসালট্যান্ট ও প্যারেন্টিং এডুকেটর পারুল মুদিত মিশ্র স্পষ্ট জানিয়েছেন, জনসমর্থিত অন্ধবিশ্বাস আর বৈজ্ঞানিক তথ্যের মধ্যে ফারাক বোঝা অত্যন্ত জরুরি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এবং ইউনিসেফ (UNICEF)-এর মতে, শিশুর প্রথম ছয় মাস শুধুমাত্র মায়ের দুধ খাওয়ানো উচিত এবং পরবর্তীতে দুই বছর বা তার বেশি সময় পর্যন্ত সঠিক পরিপূরক খাবারের পাশাপাশি স্তন্যপান চালিয়ে যাওয়া যেতে পারে।

নতুন মায়েদের মনে গেঁথে থাকা তেমনই কিছু জনপ্রিয় মিথ এবং তার পেছনের আসল সত্য তুলে ধরা হলো:

মিথ ১: স্তন্যপান করালে স্তন ঝুলে যায়
সত্য: স্তন্যপানের সঙ্গে স্তন ঝুলে যাওয়ার (Breast Ptosis) সরাসরি কোনো বৈজ্ঞানিক যোগসূত্র নেই। গর্ভাবস্থায় শরীরের নানা পরিবর্তনের কারণে স্তনের আকারে পরিবর্তন আসে। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, বয়স বাড়া, উচ্চ BMI, একাধিক গর্ভাবস্থা, গর্ভাবস্থার আগে স্তনের বড় আকার এবং ধূমপান এর মূল কারণ। WHO-এর নির্দেশিকাতেও বলা হয়েছে, গর্ভাবস্থাকালের শারীরিক পরিবর্তনগুলো ঘটে—মহিলা পরবর্তীকালে শিশুকে স্তন্যপান করান বা ফর্মুলা মিল্ক দিন। পারুল মিশ্রের কথায়, “তাই স্তন ঝুলে যাওয়ার জন্য স্তন্যপানকে অযথা দোষ দেবেন না।”

মিথ ২: ছোট স্তনযুক্ত মায়েরা পর্যাপ্ত দুধ তৈরি করতে পারেন না
সত্য: স্তনের আকার কখনই দুধ উৎপাদনের পরিমাপ নির্ধারণ করে না। স্তনের আকার মূলত ফ্যাট বা চর্বিযুক্ত কলার পরিমাণের ওপর নির্ভর করে। অন্যদিকে, দুধ উৎপাদন নির্ভর করে গ্রন্থিগুলির কার্যকারিতা এবং শিশু কত ঘন ঘন ও দক্ষতার সঙ্গে দুধ পান করছে তার ওপর। ইউনিসেফ স্পষ্ট জানিয়েছে, প্রায় সব মায়েদের পক্ষেই সন্তানের জন্য সঠিক পরিমাণে দুধ উৎপাদন করা সম্ভব। এটি সম্পূর্ণ নির্ভর করে সঠিক ল্যাচিং (Latch) বা শিশুর মুখ ধরার কায়দা এবং চাহিদার (Supply-and-Demand) ওপর।

মিথ ৩: স্তন্যপান করানোর সময় চরম যন্ত্রণা হওয়া স্বাভাবিক
সত্য: স্তন্যপান করানোর সময় দীর্ঘদিন ধরে তীব্র যন্ত্রণা বা স্তনবৃন্তে ফাটল ধরাকে কখনই স্বাভাবিক বলে মেনে নেওয়া উচিত নয়। শুরুর দিকে সামান্য অস্বস্তি হতে পারে, তবে তা সাময়িক। WHO-র মতে, ব্যথা হলে শিশুর সঠিক পজিশন ও ল্যাচিং হচ্ছে কি না তা খতিয়ে দেখা দরকার। শিশু মুখ বড় করে খুলছে কি না, তার থুতনি স্তনের সঙ্গে ঠেকে আছে কি না এবং সে ধীরে ও গভীরভাবে চুষছে কি না—এই বিষয়গুলি ঠিক থাকলে স্তন্যপান সম্পূর্ণ বেদনাহীন হয়।

মিথ ৪: বমি বা ডায়রিয়া হলে স্তন্যপান বন্ধ করে দেওয়া উচিত
সত্য: সাধারণ কোনো অসুস্থতা মানেই শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানো বন্ধ করতে হবে—এমন কোনো নিয়ম নেই। ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, মা সাধারণ কোনো রোগে আক্রান্ত হলেও যথাযথ সতর্কতা অবলম্বন করে এবং সঠিক চিকিৎসা চালিয়ে গিয়ে স্তন্যপান করাতে পারেন।

মিথ ৫: রাতের বেলা শিশুকে খাওয়ানোর প্রয়োজন নেই
সত্য: চিকিৎসাগত দিক থেকে রাতের বেলা স্তন্যপান বন্ধ করার কোনো যৌক্তিকতা নেই। WHO-র পরামর্শ অনুযায়ী, শিশুর যখনই চাহিদা হবে, দিন হোক বা রাত—চাহিদা অনুযায়ী (On-demand) স্তন্যপান করানো উচিত। নবজাতকদের ক্ষেত্রে দিনে ৮-১২ বার পর্যন্ত খাওয়ানো সম্পূর্ণ স্বাভাবিক এবং এটি দুধের জোগান বজায় রাখতে সাহায্য করে।

মিথ ৬: পর্যাপ্ত দুধের জন্য মাকে প্রচুর পরিমাণে খাবার খেতে হয়
সত্য: স্তন্যপানের সময় মায়ের বাড়তি ক্যালোরির প্রয়োজন হয় ঠিকই, তবে তার মানে এই নয় যে তাঁকে অতিরিক্ত খেতে হবে বা কোনো বিশেষ ‘ডায়েট চার্ট’ মেনে চলতে হবে। CDC-র তথ্য অনুযায়ী, পুষ্টিকর খাবার খাওয়া মায়ের জন্য জরুরি, তবে কোনো জটিল নিয়ম না মেনে সুষম ও স্বাভাবিক খাবার খাওয়াটাই শ্রেয়। মায়ের সাধারণ ডায়েটেও শিশুর প্রথম ছয় মাসের পুষ্টির চাহিদা অনায়াসে মেটে।

মাতৃত্বের এই সংবেদনশীল সময়ে মায়েরা যেন এই ধরনের ভিত্তিহীন কুসংস্কারে বিভ্রান্ত না হয়ে নিজেদের শরীরের ওপর ভরসা রাখেন—এমনটাই মত বিশেষজ্ঞদের।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *