আজ গুরু পূর্ণিমা: ঈশ্বরের চেয়েও কেন গুরুর স্থান উঁচুতে? জেনে নিন আসল রহস্য!

আজকের যুগে দাঁড়িয়ে আমাদের সকলেরই স্বপ্ন থাকে প্রচুর টাকা রোজগার করার, একটি সুন্দর গাড়ি কিংবা বিলাসবহুল বাড়ি তৈরি করার। কিন্তু এই সমস্ত পার্থিব প্রাপ্তির উপরেও এমন একটি জিনিস রয়েছে, যাকে আমাদের ধর্মশাস্ত্রে জীবনের সবচেয়ে বড় সম্পদ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। আর তা হলো—গুরুর আশীর্বাদ। আজ ২৯ জুলাই, দেশজুড়ে অত্যন্ত ভক্তি ও শ্রদ্ধার সঙ্গে পালিত হচ্ছে পবিত্র গুরু পূর্ণিমা (Guru Purnima)। কিন্তু কখনও ভেবে দেখেছেন কি, প্রাচীন শাস্ত্র এবং উপনিষদে কেন গুরুর স্থানকে সমস্তকিছুর ঊর্ধ্বে রাখা হয়েছে?

সনাতন সংস্কৃতিতে গুরুর আসন
আমাদের সনাতন সংস্কৃতি এবং ধর্মশাস্ত্রে গুরুকে কেবল একজন সাধারণ শিক্ষক হিসেবে দেখা হয়নি, বরং তাঁকে স্বয়ং ঈশ্বরের চেয়েও উঁচুতে আসন দেওয়া হয়েছে। শাস্ত্রে একটি অত্যন্ত পরিচিত ও সুন্দর শ্লোক রয়েছে—“গুরুর্বহ্মা গুরুর্বিষ্ণুঃ গুরুর্দেবঃ মহেশ্বরঃ”। অর্থাৎ, গুরুই ব্রহ্মা, গুরুই বিষ্ণু এবং গুরুই স্বয়ং মহেশ্বর। এর মূল তাৎপর্য হলো, ঈশ্বরকে পাওয়ার সঠিক পথটাও একমাত্র একজন গুরুই তাঁর শিষ্যকে দেখিয়ে দিতে পারেন।

অজ্ঞানের অন্ধকার দূর করার চাবিকাঠি
আসলে টাকা বা সম্পত্তি হয়তো আপনার জীবনের দৈনন্দিন প্রয়োজনগুলো মিটিয়ে দিতে পারে, কিন্তু কোনটা ঠিক আর কোনটা ভুল—সেই সত্য পথটি চেনার দৃষ্টিশক্তি কেবল একজন গুরুই দিতে পারেন। শাস্ত্রমতে, মানুষের মনের ভেতর যে অজ্ঞানের অন্ধকার জমে থাকে, গুরু তাঁর অকৃপণ জ্ঞানের আলো দিয়ে সেই সমস্ত অন্ধকার দূর করে দেন। যখন জীবনে কোনো কঠিন সময় আসে এবং চারপাশ অন্ধকার হয়ে যায়, তখন গুরুর দেখানো পথই মানুষকে সঠিক গন্তব্যে পৌঁছে দেয়।

শাস্ত্র বলছে, গুরু তাঁর শিষ্যকে কেবল বইয়ের গতানুগতিক বিদ্যা শেখান না, তিনি শেখান কীভাবে জীবনের কঠিন পরিস্থিতিতে বুক চিতিয়ে ধৈর্য ধরতে হয় এবং চরম বিপদেও মাথা ঠান্ডা রাখতে হয়। জীবনে বড় সাফল্য এলে যাতে মনে বিন্দুমাত্র অহংকার না আসে, আবার ব্যর্থতা এলে যাতে কেউ ভেঙে না পড়ে—সেই মানসিক জোর ও সৎ সংস্কার একমাত্র গুরুই প্রদান করতে পারেন। জাগতিক ধন-সম্পদ আজ আছে কাল শেষ হয়ে যেতে পারে, কিন্তু গুরুর দেওয়া জ্ঞান ও সুশিক্ষা সারাজীবন মানুষের সঙ্গে থাকে, যা পৃথিবীর কেউ কখনও কেড়ে নিতে পারে না।

ব্যাস পূর্ণিমা ও আজকের দিনে আমাদের কর্তব্য
মহর্ষি বেদব্যাসের (Maharishi Ved Vyas) জন্মতিথি স্মরণ করেই এই পবিত্র দিনটিকে ‘ব্যাস পূর্ণিমা’ হিসেবেও পালন করা হয়ে থাকে। গুরু কীভাবে একজন শিষ্যের জীবনের সবচেয়ে বড় আলোর দিশারি হয়ে ওঠেন, এই বিশেষ দিনটি তারই বার্তা দেয়।

এই পবিত্র গুরু পূর্ণিমায় আপনার গুরু যদি কাছে থাকেন, তবে তাঁর চরণ স্পর্শ করে আশীর্বাদ নেওয়া উচিত। আর তিনি যদি দূরে থাকেন বা এই পৃথিবীতে নাও থাকেন, তবে মন থেকে তাঁকে স্মরণ করে তাঁর দেখানো ভালো পথে চলার সংকল্প নেওয়াটাই হলো জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। শাস্ত্রমতে, কোনো দামি উপহার বা উপঢৌকনের চেয়ে গুরুর শিক্ষা নিজের জীবনে অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলা এবং একজন ভালো মানুষ হয়ে ওঠাটাই হলো গুরুকে দেওয়া সর্বশ্রেষ্ঠ প্রণাম।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *