নাভিতে নিম ও সর্ষের তেল দিয়ে ঘুমান দিলজিৎ দোসাঞ্জ! এটি কি সত্যিই স্বাস্থ্যকর নাকি স্রেফ ট্রেন্ড? জেনে নিন বিজ্ঞান কী বলছে

কনসার্টের হাউসফুল টিকিট থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক ফ্যাশন স্টেটমেন্ট—বলিউড ও পঞ্জাবি তারকা দিলজিৎ দোসাঞ্জ মানেই নিত্যনতুন ট্রেন্ড। তবে এবার তিনি তাঁর গান বা ফ্যাশনের জন্য নন, বরং রাতে ঘুমোতে যাওয়ার আগের একটি বিশেষ শারীরিক যত্ন বা ‘ওয়েলনেস’ অভ্যাসের জন্য সংবাদ শিরোনামে এসেছেন।
সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে দিলজিৎ প্রকাশ করেছেন যে, তিনি প্রতি রাতে ঘুমোতে যাওয়ার আগে নাভিতে নিম তেল এবং সর্ষের তেলের মিশ্রণ লাগান। তাঁর এই মন্তব্যের পরই সোশ্যাল মিডিয়ায় কৌতুহলের জোয়ার ভেসেছে। সবাই জানতে চাইছেন—নাভিতে তেল দিলে কি সত্যিই স্বাস্থ্যের উন্নতি হয়, নাকি এটি শুধুই আরেকটি ভাইরাল ট্রেন্ড?
কী এই দিলজিৎ দোসাঞ্জের ভাইরাল নাভির তেলের রুটিন?
‘ভোগ ইন্ডিয়া’ (Vogue India)-র ‘ইন দ্য ব্যাগ’ অনুষ্ঠানে দিলজিৎ প্রকাশ করেন যে, এটি বহু বছর ধরে তাঁর দৈনন্দিন আত্ম-যত্ন বা সেলফ-কেয়ার রুটিনের একটি অংশ।
কীভাবে ব্যবহার করেন: তিনি নিম তেল এবং সর্ষের তেল একসঙ্গে মিশিয়ে রাতে শোওয়ার আগে নাভিতে কয়েক ফোঁটা দেন।
পদ্ধতি: তেল দেওয়ার পর তিনি প্রায় ৩০ মিনিট চিত হয়ে শুয়ে থাকেন এবং তারপর হালকা হাতে নাভির চারপাশে ম্যাসাজ করেন।
কারণ: দিলজিতের বিশ্বাস, নাভির সঙ্গে শরীরের অন্যান্য অঙ্গের গভীর সংযোগ রয়েছে, যা সার্বিক সুস্থতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
‘নাভি পুরণ’ বা নাভিতে তেল দেওয়া আসলে কী?
আয়ুর্বেদে এই পদ্ধতিটিকে ‘নাভি পুরণ’ (Nabhi Purana) বলা হয়। এতে হালকা গরম তেল নাভিতে দিয়ে তার চারপাশের ত্বকে ম্যাসাজ করা হয়। আয়ুর্বেদিক চিকিৎসকদের মতে, নাভি হজমপ্রক্রিয়া, রক্ত সঞ্চালন এবং শরীরের ভারসাম্যের কেন্দ্রবিন্দু।
বিভিন্ন তেলের উপকারিতা সম্পর্কে প্রচলিত ধারণা:
নিম তেল: জীবাণুনাশক (Antimicrobial) এবং প্রদাহরোধী গুণাবলির জন্য ব্যবহার করা হয়।
সর্ষের তেল: রক্ত সঞ্চালন বাড়াতে এবং শরীরে উষ্ণতা জোগাতে সাহায্য করে।
তিল তেল: মানসিক প্রশান্তি এবং পুষ্টি জোগাতে সাহায্য করে।
নারকেল তেল: ত্বকের আদ্রতা বজায় রাখতে এবং শরীর ঠান্ডা রাখতে ব্যবহৃত হয়।
এরোন্ডের তেল (Castor Oil): হজমশক্তি বাড়াতে এবং কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে ঐতিহ্যগতভাবে ব্যবহৃত।
আধুনিক বিজ্ঞান ও চিকিৎসকরা কী বলছেন?
সহজ কথায় বিজ্ঞান এই ধরনের সামাজিক মাধ্যমের দাবিগুলোকে পুরোপুরি সমর্থন করে না। চিকিৎসকদের মতে, নাভিতে নিম বা সর্ষের তেল দিলেই যে অলৌকিকভাবে শরীরের ভেতরের অঙ্গ রোগমুক্ত হবে—এমন কোনো শক্তিশালী বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নাভিতে তেল দিলে যে বিষয়গুলো সম্ভব নয়:
হরমোনের ভারসাম্য রক্ষা করা।
শরীরের ভেতর থেকে হজম প্রক্রিয়ার উন্নতি ঘটানো।
বিষাক্ত পদার্থ বের করে দেওয়া (Detoxification)।
দীর্ঘস্থায়ী বা ক্রনিক ব্যাধি নিরাময় করা।
প্রজনন ক্ষমতা বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা রাতারাতি বাড়ানো।
চিকিৎসকরা স্পষ্ট করেছেন যে, নাভিতে লাগানো তেল শরীরের ভেতরে প্রবেশ করে সরাসরি কোনো ভেতরের অঙ্গ বা স্বাস্থ্য সমস্যার চিকিৎসা করতে পারে—এমন কোনো শারীরিক বা অ্যানাটমিক্যাল মাধ্যম মানুষের শরীরে নেই।
তবে কেন মানুষ এর সুফল পান বলে দাবি করেন?
বিজ্ঞানীরা মনে করেন, কিছু নির্দিষ্ট কারণে মানুষ এই রুটিন অনুসরণের পর ভালো বোধ করতে পারেন:
১. মানসিক প্রশান্তি (Relaxation): রাতে ঘুমোতে যাওয়ার আগে পেটে কয়েক মিনিট ম্যাসাজ করলে শরীরের নার্ভ রিল্যাক্স হয়, যা মানসিক চাপ কমায় এবং ঘুমের গুণমান বাড়াতে সাহায্য করে।
২. ত্বকের উপকার: সর্ষে এবং নিম তেল নাভির চারপাশের শুষ্ক ত্বককে নরম ও আর্দ্র রাখে। নিম তেলের অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল গুণাবলী ত্বকের বাহ্যিক ইনফেকশন রোধে সাহায্য করে।
৩. মনস্তাত্ত্বিক আরাম: এটি আয়ুর্বেদিক রুটিনের একটি অংশ হওয়ায় ম্যাসাজ বা ধ্যান করার মতোই মানসিক শান্তি ও আরাম দেয়।
সিদ্ধান্ত: এটি একটি ওয়েলনেস রুটিন, কোনো চিকিৎসা নয়
দিলজিৎ দোসাঞ্জের এই রুটিনটি প্রাচীন আয়ুর্বেদিক চর্চাকে আবারও চর্চায় এনেছে। নাভিতে তেল দেওয়া ত্বকের আর্দ্রতা বজায় রাখতে এবং মনকে শান্ত রাখতে সাহায্য করতেই পারে। তবে আয়ুর্বেদিক আমেজ পেতে এবং শরীর রিল্যাক্স করতে চাইলে দিলজিতের এই টোটকাটি ট্রাই করতেই পারেন—কিন্তু এটিকে বড় কোনো শারীরিক সমস্যার মহাঔষধ ভাবলে ভুল হবে!