ডিগ্রির গণ্ডি পেরিয়ে চাকরির বদলে সরাসরি উদ্যোক্তা! পাঞ্জাবের ‘বিজনেস ক্লাস’ মডেলে প্রথম বছরেই ৯০ কোটির ব্যবসা

মুখ্যমন্ত্রী ভগবন্ত সিংহ মানের নেতৃত্বাধীন পাঞ্জাব সরকারের ‘শিক্ষা ক্রান্তি’ (Sikhya Kranti) বা শিক্ষা বিপ্লবের হাত ধরে রাজ্যের উচ্চ ও কারিগরি শিক্ষা ক্ষেত্রে এক যুগান্তকারী সাফল্যের সূচনা হয়েছে। রাজ্যের বিভিন্ন কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে চালু হওয়া প্রশংসিত ‘বিজনেস ক্লাস’ (Business Class) প্রোগ্রামের প্রথম বছরই অভাবনীয় ও তাক লাগানো ফল সামনে এসেছে। বি.কম, বিবিএ, বি.টেক, বি.ভোক কোর্স এবং আইটিআই ও পলিটেকনিকের পঠনপাঠনের পাশাপাশি এই কর্মসূচিকে বাধ্যতামূলক বিষয় হিসেবে যুক্ত করা হয়েছিল। যার ফলে প্রথম বছরেই পাঞ্জাব জুড়ে প্রায় ৯৫,০০০ শিক্ষার্থী এই অনন্য প্রকল্পের সুবিধা গ্রহণ করেছেন। আর এই উদ্যোগের হাত ধরেই ২৫,৬৮৩ জন শিক্ষার্থী নিজস্ব ব্যবসা শুরু করেছেন এবং এর মধ্যে ২০,২৪১টি নতুন স্টার্ট-আপ ও ব্যবসা ইতিমধ্যেই প্রায় ৯০ কোটি টাকার রাজকীয় রাজস্ব বা টার্নওভার অর্জন করেছে।

শিক্ষার উদ্দেশ্যই বদলে দিচ্ছে পাঞ্জাব সরকার
এই বিরাট সাফল্যে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে পাঞ্জাবের উচ্চ ও কারিগরি শিক্ষামন্ত্রী হরজৎ সিং বৈন্স বলেন, “পাঞ্জাবের ‘বিজনেস ক্লাস’ কর্মসূচি শিক্ষার মূল উদ্দেশ্যকেই সম্পূর্ণ নতুন রূপ দিচ্ছে। আমাদের লক্ষ্য কেবল শিক্ষার্থীদের হাতে কতগুলি ডিগ্রি তুলে দেওয়া নয়, বরং তরুণ উদ্ভাবক, সফল উদ্যোক্তা এবং আগামী দিনের কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী একটি শক্তিশালী প্রজন্ম তৈরি করা। প্রায় ৯৫,০০০ শিক্ষার্থী তাঁদের নিজস্ব ব্যবসায়িক আইডিয়া নিয়ে কাজ করেছেন এবং ২৫ হাজারের বেশি তরুণ নিজেদের ব্যবসা শুরু করে প্রথম বছরেই ৯০ কোটি টাকার ব্যবসা করেছেন—এটিই প্রমাণ করে যে যুবসমাজকে সঠিক সুযোগ দিলে তারা অর্থনীতিকে বদলে দিতে পারে।” শিক্ষামন্ত্রী আরও যোগ করেন যে, মুখ্যমন্ত্রী ভগবন্ত সিংহ মানের দূরদর্শী নেতৃত্বে পাঞ্জাবের এই শিক্ষা বিপ্লব তরুণ প্রজন্মকে কেবল আগামী দিনের চাকরির জন্যই নয়, বরং নতুন সুযোগ তৈরির কারিগর হিসেবে গড়ে তুলছে।

কীভাবে বদলে গেল প্রথাগত শিক্ষার ধারা?
প্রথাগত শিক্ষার একঘেয়েমি কাটিয়ে শিক্ষার্থীদের শুধুমাত্র বইয়ের পাতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বাস্তবমুখী দক্ষতাসম্পন্ন করে তোলার জন্যই এই কর্মসূচি আনা হয়েছিল। ২০২০-২৫ শিক্ষাবর্ষে ২০টি বিশ্ববিদ্যালয়, ৪৯৪টি কলেজ, ৩২০টি আইটিআই এবং ৯১টি পলিটেকনিক সহ রাজ্যের মোট ৯২৫টি উচ্চ ও কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এই দুই ক্রেডিটের বাধ্যতামূলক কোর্স চালু করা হয়। এর ফলে শিক্ষার্থীরা সুযোগ পান ব্যবসার সুযোগ চিহ্নিত করা, মার্কেট ভ্যালিডেশন, ডিজিটাল উপস্থিতি, মূল্য নির্ধারণের কৌশল, গ্রাহক অর্জন, আর্থিক পরিকল্পনা এবং সমস্যা সমাধানের মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও বাস্তবমুখী ব্যবসায়িক জ্ঞান অর্জনের। ফলস্বরূপ, প্রায় ৫৭,০০০ শিক্ষার্থী (মোট অংশগ্রহণকারীর প্রায় ৬০ শতাংশ) তাঁদের পড়াশোনার সঙ্গেই সক্রিয়ভাবে বিভিন্ন বাণিজ্যিক কার্যকলাপে যুক্ত হন।

রাজ্যের তরুণরা ই-কমার্স, বেকারি ও ফুড সার্ভিসেস, ডিজিটাল কন্টেন্ট তৈরি, কোডিং, গ্রাফিক ডিজাইন, ফিটনেস ও ওয়েলনেস, রিটেল, বিউটি কেয়ার, কৃষিভিত্তিক উদ্যোগ এবং স্থানীয় বিভিন্ন পরিষেবা খাতে নিজেদের স্টার্ট-আপ গড়ে তুলেছেন। যার জ্বলন্ত উদাহরণ অমৃতসরের গুরু নানক দেব ইউনিভার্সিটির কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ছাত্র সৌরভ। তিনি ‘মক ইন মাচা’ (Mock, in Matcha) নামের একটি বেভারেজ ভঞ্চার শুরু করেছেন, যা কলেজ ফেস্টে বিক্রি করে প্রায় ৯০,০০০ টাকা আয় করেছে। অন্যদিকে বাথিন্দার মহারাজা রণজিত সিংহ পঞ্জাব টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটির শরণবীর সিং তৈরি করেছেন ‘স্কিলেক্সাস’ (Skillexus) নামক একটি ডিজিটাল কেরিয়ার গাইডেন্স প্ল্যাটফর্ম, যা ইতিমধ্যে আড়াই লক্ষেরও বেশি ব্যবহারকারীকে আকর্ষণ করেছে। জলন্ধরের সন্ত বাবা ভাগ সিং ইউনিভার্সিটির ছাত্র পঙ্কজ ‘জারিয়া জুয়েলারি’ নামে ইনস্টাগ্রাম ও ইউটিউব-ভিত্তিক একটি অনলাইন কৃত্রিম গহনার ব্যবসা শুরু করে প্রায় ৩০,০০০ টাকা আয় করেছেন। পাটিয়ালার সরকারি আইটিআই-এর কমলজিৎ সিং ‘কেএমএল মাশরুম’ (KML Mushroom) নামে মাশরুম চাষ ও নিজস্ব ব্র্যান্ড প্যাকেজিংয়ের মাধ্যমে প্রায় ১.৫ লক্ষ টাকার ব্যবসা করেছেন। মোহালির মহিলা সরকারি আইটিআই-এর গগনপ্রীত কৌর রাঙ্গি ‘নেল স্টুডিও বাই গগন’ নামে ঘরোয়া নেল আর্টের ব্যবসা এবং রমনদীপ সিং ইলেকট্রনিক্সের অনলাইন ব্যবসা শুরু করে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন।

আগামী দিনে আরও বড় সম্প্রসারণের পরিকল্পনা
প্রথম বছরের এই দুর্দান্ত সাফল্যের পর পাঞ্জাবের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যরা সর্বসম্মতভাবে আগামী ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে এই ‘বিজনেস ক্লাস’ প্রোগ্রামটি সমস্ত স্নাতক বা আন্ডারগ্র্যাজুয়েট ডিগ্রি কোর্সে প্রসারিত করার সুপারিশ করেছেন। এতদিন এটি শুধুমাত্র নির্দিষ্ট কিছু কারিগরি ও প্রফেশনাল কোর্সের জন্য থাকলেও, এখন থেকে বিএ, বিএসসি এবং অন্যান্য সাধারণ স্নাতক স্তরের ছাত্রছাত্রীরাও তাঁদের নিয়মিত পড়াশোনার পাশাপাশি এই ব্যবহারিক উদ্যোক্তা প্রশিক্ষণ নেওয়ার সুযোগ পাবেন।

মুখ্যমন্ত্রী ভগবন্ত সিংহ মানের সরকারের এই সুদূরপ্রসারী ভাবনা আজ রাজ্যের তরুণ প্রজন্মকে চাকরির পেছনে না ছুটে নিজেরাই চাকরিদাতা হয়ে ওঠার আত্মবিশ্বাস জুগিয়েছে। মোহালির আইটিআই ছাত্রী গগনপ্রীত কৌর রাঙ্গির কথায়, “বিজনেস ক্লাস প্রোগ্রাম আসার আগে আমি ভাবতাম চাকরি পাওয়াই একমাত্র পথ। কিন্তু এই কর্মসূচি আমার মানসিকতা সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছে। আজ আর আমি শুধু চাকরির খোঁজ করি না, নিজের ব্যবসা গড়ে তুলে অন্যদের জন্যও কাজের সুযোগ তৈরি করতে অনুপ্রাণিত হই।”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *