হার্ট ভালো না থাকলে ব্রেনও বাঁচবে না! বিশ্ব ব্রেন ডে-তে চিকিৎসকদের ভয়ঙ্কর সতর্কবার্তা

এতদিন হৃদরোগ এবং মস্তিষ্কের সমস্যাকে সম্পূর্ণ আলাদা দুটি স্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করা হলেও চিকিৎসকরা বারবার জোর দিয়ে বলছেন যে এই দুটি অঙ্গ একে অপরের সঙ্গে ওপ্রোতোভাবে যুক্ত। প্রতিটি হৃদস্পন্দন মস্তিষ্ককে সচল রাখতে প্রয়োজনীয় অক্সিজেন ও পুষ্টি সরবরাহ করে। ফলে হৃদপিণ্ড বা রক্তনালীতে কোনো গোলযোগ দেখা দিলে সবার আগে ক্ষতিগ্রস্ত হয় আমাদের মস্তিষ্ক।

বিশ্ব ব্রেন ডে (২২ জুলাই) উপলক্ষ্যে দেশের বিশিষ্ট স্নায়ু বিশেষজ্ঞরা সাধারণ মানুষকে স্ট্রোক, স্মৃতিশক্তি হ্রাস এবং ডিমেনশিয়ার মতো সমস্যাগুলিকে কেবল বার্ধক্যের রোগ হিসেবে দেখার ভুল না করার পরামর্শ দিয়েছেন। বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, মস্তিষ্কের আসল সুরক্ষা শুরু হয় অনেক কম বয়স থেকেই—যার মূল চাবিকাঠি হলো রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ, ডায়াবেটিস ও কোলেস্টেরল ম্যানেজমেন্ট, শারীরিক সক্রিয়তা বজায় রাখা এবং স্বাস্থ্যকর জীবনধারা বেছে নেওয়া। বিশেষ করে কম বয়সিদের মধ্যে লাইফস্টাইলজনিত রোগের প্রকোপ যেভাবে বাড়ছে, তাতে দীর্ঘমেয়াদী স্ট্রোক ও স্মৃতিশক্তি হ্রাসের ঝুঁকি মারাত্মকভাবে বেড়ে চলেছে। ওয়ার্ল্ড ফেডারেশন অফ নিউরোলজির ২০২৬ সালের বিশ্ব ব্রেন ডে-র প্রতিপাদ্য—”ব্রেন হেল্থ: অ্যাক্সেস ফর অল” বা সকলের জন্য মস্তিষ্কের স্বাস্থ্য—এটিও স্পষ্টভাবে মনে করিয়ে দেয় যে নিউরোলজিক্যাল রোগের ক্রমবর্ধমান বোঝা কমাতে প্রতিরোধ ও সময়মতো চিকিৎসা অত্যন্ত জরুরি।

পুণ্যের অ্যাপোলো হাসপাতালের নিউরোসার্জারি অ্যান্ড ইন্টারভেনশনাল বিভাগের কনসালট্যান্ট ডা. ইশান্ত রেগের কথায়, “প্রতিটি হৃদস্পন্দন মস্তিষ্ককে পুষ্টি জোগায়। যখন আমরা স্বাস্থ্যকর জীবনযাত্রার মাধ্যমে এবং সঠিক সময়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে আমাদের হৃদয়কে রক্ষা করি, তখন আসলে আমরা আমাদের স্মৃতিশক্তি, বুদ্ধিমত্তা এবং সামগ্রিক স্নায়ুর স্বাস্থ্যকেও সুরক্ষিত রাখছি।”

কেন হার্টের স্বাস্থ্য সরাসরি মস্তিষ্কে প্রভাব ফেলে?
আমাদের শরীরের মোট ওজনের মাত্র ২ শতাংশ হলো মস্তিষ্ক, অথচ এটি শরীরের মোট অক্সিজেন সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ ব্যবহার করে। এই পুরো অক্সিজেন সরবরাহ করে হৃদপিণ্ড দ্বারা পাম্প করা রক্ত। রক্তনালীর সংকোচন, অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস বা উচ্চ কোলেস্টেরলের কারণে রক্ত চলাচলে সামান্য বিঘ্ন ঘটলেই মস্তিষ্কের কোষগুলি অক্সিজেন থেকে বঞ্চিত হতে পারে, যা স্ট্রোক এবং দীর্ঘমেয়াদী জ্ঞানীয় দুর্বলতার ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

কার্ডিওভাসকুলার রোগগুলি বছরের পর বছর ধরে মস্তিষ্কে পুষ্টি জোগানো সূক্ষ্ম রক্তনালীগুলিকেও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে, যাকে চিকিৎসকরা “ভাসকুলার কগনিটিভ ইমপেয়ারমেন্ট” বলে থাকেন। এর ফলে মানুষের স্মৃতিশক্তি, চিন্তা করার ক্ষমতা এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার দক্ষতা ধীরে ধীরে কমতে থাকে।

সমস্যা কেবল অবরুদ্ধ ধমনীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। অ্যাট্রিয়াল ফিব্রিলেশন (AF)-এর মতো সাধারণ হার্টের রিদমজনিত ব্যাধিগুলির কারণে রক্ত জমাট বেঁধে তা মস্তিষ্কে পৌঁছাতে পারে, যা ইস্কেমিক স্ট্রোকের কারণ হয়। এমনকি স্ট্রোকের লক্ষণ প্রকাশ না পেলেও এটি স্মৃতিশক্তি হ্রাসের পথ প্রশস্ত করতে পারে।

উচ্চ রক্তচাপই সবচেয়ে বড় নীরব ঘাতক
চিকিৎসকদের মতে, সমস্ত কার্ডিওভাসকুলার ঝুঁকির মধ্যে উচ্চ রক্তচাপ বা হাইপারটেনশন মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যের সবচেয়ে বড় শত্রু। একে প্রায়শই “নীরব ঘাতক” বলা হয়, কারণ এটি সাধারণত কোনো স্পষ্ট উপসর্গ ছাড়াই শরীরে বাসা বাঁধে এবং ধীরে ধীরে মস্তিষ্কের রক্তনালীগুলিকে ধ্বংস করে। অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপ ব্লক করা রক্তনালীর কারণে ইস্কেমিক স্ট্রোক এবং রক্তপাতের কারণে হেমোরেজিক স্ট্রোক—উভয়েরই অন্যতম প্রধান কারণ।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে প্রায় ১.৪ বিলিয়ন মানুষ উচ্চ রক্তচাপে ভুগছেন, অথচ প্রতি চারজনের মধ্যে মাত্র একজন তাদের রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হন। নিয়মিত স্ক্রিনিং, সময়মতো ওষুধ খাওয়া এবং জীবনযাত্রায় সুনির্দিষ্ট পরিবর্তন আনা স্ট্রোকের ঝুঁকি কমানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায়।

সহজ জীবনযাত্রার মাধ্যমেই সুরক্ষিত রাখুন দুই অঙ্গ
ডা. ইশান্ত রেগের মতে, হার্ট ও ব্রেনকে সুরক্ষিত রাখতে কোনো জটিল চিকিৎসার প্রয়োজন হয় না। সাধারণ কিছু অভ্যাসের মাধ্যমেই স্নায়ুর রোগের ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব:

সপ্তাহে বেশিরভাগ দিন অন্তত ৩০ মিনিট মাঝারি ধরনের শারীরিক পরিশ্রম বা ব্যায়াম করা।

ফল, শাকসবজি, গোটা শস্য, বাদচবাদাম এবং স্বাস্থ্যকর চর্বিযুক্ত সুষম খাদ্য গ্রহণ।

সব ধরনের তামাকজাত দ্রব্য বর্জন করা।

মদ্যপান সীমিত রাখা।

শরীরের সঠিক ওজন বজায় রাখা।

প্রতি রাতে ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা গভীর ঘুম নিশ্চিত করা।

ব্যায়াম, ধ্যান বা রিলাক্সেশনের মাধ্যমে মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ করা।

এই অভ্যাসগুলি রক্তনালীর স্বাস্থ্য উন্নত করতে, দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ কমাতে এবং সারাজীবন মস্তিষ্কে অক্সিজেন সমৃদ্ধ রক্তের যোগান ঠিক রাখতে সাহায্য করে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ডিমেনশিয়া ঝুঁকি হ্রাস সংক্রান্ত নির্দেশিকা অনুসারে, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, ধূমপান এবং শারীরিক নিষ্ক্রিয়তার মতো পরিবর্তনযোগ্য ঝুঁকিগুলিকে ঠিক করতে পারলে প্রায় ৪৫ শতাংশ পর্যন্ত ডিমেনশিয়া প্রতিরোধ বা বিলম্বিত করা সম্ভব।

স্ট্রোকের লক্ষণ চিনে রাখলে বাঁচতে পারে প্রাণ
চিকিৎসায় বহু উন্নতি হওয়া সত্ত্বেও স্ট্রোক বিশ্বব্যাপী অক্ষমতার অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে রয়ে গেছে। স্নায়ু বিশেষজ্ঞরা জোর দিয়ে বলছেন যে রক্তপ্রবাহ বন্ধ হওয়ার কয়েক মিনিটের মধ্যেই মস্তিষ্কের কোষগুলি মারা যেতে শুরু করে, তাই এক্ষেত্রে প্রতিটা মুহূর্ত মূল্যবান।

যদি কোনো ব্যক্তির মধ্যে হঠাৎ করে নিচের লক্ষণগুলি দেখা যায়, তবে অবিলম্বে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাওয়া উচিত:

মুখ, হাত বা পায়ের যেকোনো এক দিক হঠাৎ দুর্বল বা অবশ হয়ে যাওয়া।

কথা বলতে বা অন্যের কথা বুঝতে সমস্যা হওয়া।

ভারসাম্য বা সমন্বয় নষ্ট হয়ে যাওয়া।

এক বা উভয় চোখে দৃষ্টিশক্তি হঠাৎ কমে যাওয়া।

তীব্র ও অব্যক্ত মাথা ব্যথা।

সময়মতো চিকিৎসা শুরু হলে রোগীর সুস্থ হয়ে ওঠার সম্ভাবনা বহুগুণ বেড়ে যায় এবং স্থায়ী অক্ষমতার ঝুঁকি কমে। চিকিৎসকদের মতে, কুড়ি, ত্রিশ কিংবা চল্লিশের কোঠায় মানুষ যেমন জীবনযাপন করেন, তার ওপর নির্ভর করে ভবিষ্যতে তাদের ডিমেনশিয়া বা স্ট্রোকের ঝুঁকি কতটা থাকবে। তাই ব্রেন ও হার্ট সুস্থ রাখতে সচেতনতার শুরুটা হতে হবে আজ থেকেই।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *