সারাক্ষণই কিছু না কিছু খেতে ইচ্ছে করে? শরীরে কোন মারণ ঘাটতির লক্ষণ এটি, জেনে নিন এখনই

দুপুর বা রাতের খাবার পেট পুরে খাওয়ার ঠিক কিছুক্ষণ পরই কি আবার আপনার খিদে পেয়ে যাচ্ছে? সারাক্ষণই কি মুখ চালাতে ইচ্ছে করে, মনে হয় ফ্রিজ খুলে কিছু একটা খাই? অনেকেই এই অভ্যাসটিকে অত্যন্ত সাধারণ বা স্রেফ ‘খাদ্যরসিকতা’ বলে এড়িয়ে যান। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে অন্য কথা। বারবার খিদে পাওয়ার এই প্রবণতা আসলে কোনো সাধারণ বিষয় নয়, বরং এটি শরীরে বাসা বাঁধা ‘হিডেন হাঙ্গার’ বা লুকানো ক্ষুধার অন্যতম বড় লক্ষণ হতে পারে। অর্থাৎ, শরীর পর্যাপ্ত ক্যালরি পেলেও অতি প্রয়োজনীয় ভিটামিন ও খনিজের ঘাটতির কারণে বারবার আপনার মস্তিষ্কে খাবারের ভুল সংকেত পাঠাচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শরীরের সুস্থ ও স্বাভাবিক কার্যকারিতার জন্য শুধু ভাত, রুটি বা সাধারণ ক্যালরিযুক্ত খাবারই যথেষ্ট নয়। শরীরকে সচল রাখতে প্রতিদিন প্রয়োজন আয়রন, জিঙ্ক, ভিটামিন বি-কমপ্লেক্স, ভিটামিন ডি এবং ম্যাগনেসিয়ামের মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অণুপুষ্টি। এগুলোর সামান্যতম ঘাটতি হলেই শরীরের বিপাকক্রিয়া, শক্তি উৎপাদন এবং খিদে নিয়ন্ত্রণের স্বাভাবিক ছন্দ পুরোপুরি বিগড়ে যায়।

নিচে আলোচনা করা হলো ঠিক কোন কোন পুষ্টির অভাবে আপনার বারবার খিদে পেতে পারে:

১. ভিটামিন ডি-এর ঘাটতি ও হরমোনের খেলা
আমাদের শরীরে খিদে এবং তৃপ্তির অনুভূতি নিয়ন্ত্রণ করে ‘লেপটিন’ নামের একটি হরমোন। এটি মস্তিষ্ককে বার্তা পাঠায় যে শরীরের আর খাবারের প্রয়োজন নেই। কিন্তু একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে, শরীরে যদি ভিটামিন ডি-এর ঘাটতি থাকে, তবে লেপটিন হরমোন তার স্বাভাবিক কার্যকারিতা হারিয়ে ফেলে। ফলে পেট ভরা থাকলেও মস্তিষ্ক তৃপ্তির সংকেত পায় না এবং বারবার খিদে পেতে থাকে।

২. ম্যাগনেসিয়ামের অভাব ও মিষ্টির প্রতি আকর্ষণ
সরাসরি ম্যাগনেসিয়ামের অভাবে সারাক্ষণ খিদে পাওয়ার অকাট্য প্রমাণ না থাকলেও, এর ঘাটতি হলে মানুষের মিষ্টি, চকলেট বা অতিরিক্ত কার্বোহাইড্রেটযুক্ত (Fast Food) খাবারের প্রতি তীব্র আকর্ষণ তৈরি হয়। এর পাশাপাশি শরীরে চরম ক্লান্তি, অবসাদ, পেশিতে টান এবং মনোযোগের অভাব দেখা দিতে পারে।

৩. শক্তি উৎপাদনে বাধা দিচ্ছে ভিটামিন বি-এর অভাব
ভিটামিন বি-কমপ্লেক্স (বিশেষ করে ভিটামিন বি১, বি৩, বি৬, বি৯ এবং বি১২) আমাদের খাওয়া খাবারকে ভেঙে শক্তিতে রূপান্তর করতে সাহায্য করে। এই ভিটামিনের ঘাটতি হলে খাবার খাওয়ার পরেও শরীর তা থেকে পর্যাপ্ত শক্তি পায় না এবং দ্রুত ক্লান্ত হয়ে পড়ে। এই শক্তির ঘাটতি মেটাতে শরীর বারবার অতিরিক্ত খাবারের চাহিদা প্রকাশ করে, যার ফলে আপনার ঘনঘন খিদে পায়।

৪. আয়রনের ঘাটতি ও ক্লান্তি
শরীরে অক্সিজেন পরিবহনের মূল চাবিকাঠি হলো আয়রন। আয়রনের অভাবে রক্তস্বল্পতা বা অ্যানিমিয়া দেখা দেয়, যার সরাসরি প্রভাব পড়ে আমাদের এনার্জি লেভেলে। শরীর যখন অক্সিজেনের অভাবে দুর্বল বোধ করে, তখন তাৎক্ষণিক শক্তির খোঁজে সে বেশি বেশি খাবার দাবি করে।

লুকিয়ে থাকতে পারে অন্য কোনো বড় রোগও!
চিকিৎসকদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে এই অস্বাভাবিক খিদে পাওয়ার সমস্যা শুধুই পুষ্টির ঘাটতি নয়, বরং টাইপ-২ ডায়াবেটিস, অতিসক্রিয় থাইরয়েড (হাইপারথাইরয়েডিজম) কিংবা অন্যান্য জটিল বিপাকজনিত সমস্যারও প্রাথমিক উপসর্গ হতে পারে। তাই এই লক্ষণটিকে হালকাভাবে নেওয়া বড় ভুল হতে পারে।

এই সমস্যা থেকে মুক্তির উপায়:
খাদ্যতালিকায় বৈচিত্র্য আনুন: প্রতিদিনের ডায়েটে শুধু কার্বোহাইড্রেট না রেখে মাছ, মাংস, ডিম, দুধ, ডাল, বাদাম, সবুজ শাকসবজি ও মরসুমি ফল রাখুন।

রোদ গায়ে লাগান: শরীরে ভিটামিন ডি-এর প্রাকৃতিক জোগান বাড়াতে প্রতিদিন সকালের নরম রোদে কিছুটা সময় কাটান।

পর্যাপ্ত জল ও ঘুম: প্রতিদিন অন্তত ৭-৮ ঘণ্টা গভীর ঘুম এবং পর্যাপ্ত পরিমাণ জল পান করা অত্যন্ত জরুরি।

শারীরিক কসরত: নিয়মিত হালকা ব্যায়াম বা হাঁটার অভ্যাস করুন, যা শরীরের বিপাকক্রিয়া স্বাভাবিক রাখতে সাহায্য করে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *