৬ রাজ্যে পলাতক জীবন, এসটিএফ-এর জালে দেবরাজ চক্রবর্তী: কীভাবে ধরা পড়লেন প্রাক্তন কাউন্সিলর?

দীর্ঘ এক সপ্তাহের শ্বাসরুদ্ধকর অভিযানের পর অবশেষে রাজ্য পুলিশের এসটিএফ (STF)-এর জালে ধরা পড়লেন বিধাননগর পুরনিগমের প্রাক্তন কাউন্সিলর দেবরাজ চক্রবর্তী। পুলিশি নজরদারি এড়াতে তিনি অবলম্বন করেছিলেন একের পর এক অভিনব কৌশল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত গোয়েন্দা তৎপরতার কাছে নতি স্বীকার করতে হলো তাঁকে।

কীভাবে পালাচ্ছিলেন দেবরাজ? তদন্তকারী সূত্রের খবর, গত ২৫ জুন থেকে ১ জুলাই পর্যন্ত—টানা সাত দিন দেবরাজ চক্রবর্তী ছিলেন ‘পলাতক’। ওড়িশা, অন্ধ্রপ্রদেশ, তামিলনাড়ু, কেরালা হয়ে ঝাড়খণ্ড পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল তাঁর এই সফর। পুলিশি নজরদারি এড়াতে তিনি নিজের ব্যক্তিগত বা পরিচিত কোনো গাড়ি ব্যবহার করেননি। পরিবর্তে, আন্তঃরাজ্য যাতায়াতের জন্য বেছে নিয়েছিলেন সাধারণ যাত্রীবাহী বাস। মূলত রেলস্টেশন বা বাস টার্মিনাস সংলগ্ন সস্তা হোটেলগুলোই ছিল তাঁর আস্তানা।

পরিচয় গোপনের অভিনব কৌশল: তদন্তে বেরিয়ে এসেছে, হোটেলে পরিচয়পত্র জমা দেওয়ার ক্ষেত্রে তিনি অত্যন্ত সতর্ক ছিলেন। আধার কার্ডে যেহেতু ডিজিটাল ট্র্যাকিং ও বিস্তারিত তথ্য থাকে, তাই তিনি আধার কার্ডের পরিবর্তে ভোটার কার্ড জমা দিতেন। তাঁর ধারণা ছিল, ভোটার কার্ড সাদাকালো এবং ঝাপসা হওয়ার কারণে হোটেলে তাঁর পরিচয় নিশ্চিত করা কঠিন হবে। এছাড়া, অনেক ক্ষেত্রেই পরিচয়পত্র না দিয়ে মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে ম্যানেজ করার চেষ্টাও করেছিলেন তিনি।

প্রযুক্তিকে ফাঁকি দেওয়ার চেষ্টা: তদন্তকারীদের চোখে ধুলো দিতে কলকাতা থেকে পালানোর সময় তিনি একটি নতুন অ্যান্ড্রয়েড ফোন ও নতুন সিম কার্ড কিনেছিলেন। অনলাইনের বদলে সর্বত্র নগদ অর্থে লেনদেন করতেন যাতে কোনো ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট না থাকে। নিজের মোবাইলের ব্যবহার কমিয়ে অত্যন্ত সতর্কভাবে পরিচিতদের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখতেন তিনি।

এসটিএফ-এর ‘অপারেশন’: গোয়েন্দাদের কাছে খবর ছিল যে দেবরাজ শেষ পর্যন্ত ঝাড়খণ্ডের রাঁচিতে এক শিল্পপতির আশ্রয়ে আত্মগোপন করার পরিকল্পনা করছেন। কিন্তু তাঁর এই গতিবিধির ওপর শুরু থেকেই এসটিএফ-এর বিশেষ দল নজর রেখেছিল। প্রযুক্তিগত তথ্য, গোপন সূত্র এবং স্থানীয় গোয়েন্দা তথ্যের ওপর ভিত্তি করে বুধবার বিকেলে বাংলা-ঝাড়খণ্ড সীমান্ত সংলগ্ন পুরুলিয়ার একটি কটেজ থেকে তাঁকে পাকড়াও করা হয়।

তদন্তের পরবর্তী ধাপ: বর্তমানে পুলিশ হেফাজতে থাকা দেবরাজ চক্রবর্তীকে জেরা করে পুলিশ জানতে চাইছে—এই দীর্ঘ সাত দিন তাঁকে কারা সরাসরি সাহায্য করেছিলেন, অর্থের যোগান কে দিয়েছিল এবং ঝাড়খণ্ডে ঠিক কাদের কাছে তিনি আশ্রয় নিতে চেয়েছিলেন। তদন্তকারী সূত্রের ইঙ্গিত, তাঁকে সহায়তা করা ব্যক্তিদের চিহ্নিত করা হয়েছে এবং খুব শীঘ্রই তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হতে পারে। প্রাক্তন বিধায়িকা অদিতি মুন্সির স্বামীর এই গ্রেফতারি এখন রাজ্য রাজনীতিতে বড়সড় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *