ইরান-আমেরিকা যুদ্ধের মাঝে ভারতীয় নৌবাহিনীর রুদ্ধশ্বাস অপারেশন! কীভাবে বাঁচল দেশের অর্থনীতি?

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ঐতিহাসিক শান্তি চুক্তির পর বিশ্ব যখন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছে, ঠিক তখনই পর্দার আড়ালে থাকা ভারতীয় নৌবাহিনীর একটি বীরত্বপূর্ণ অভিযানের রোমহর্ষক কাহিনী সামনে এসেছে। এই একটিমাত্র রুদ্ধশ্বাস অপারেশন ভারতকে এক মহাসংকট এবং দেশের অর্থনীতিকে নিশ্চিত পতনের হাত থেকে রক্ষা করেছে।

যুদ্ধক্ষেত্রে অবরুদ্ধ ভারতের ‘লাইফলাইন’
গত ২৮শে ফেব্রুয়ারি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল আচমকা ইরানের ওপর হামলা চালালে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে যুদ্ধ শুরু হয়। ক্ষুব্ধ ইরান সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক জলপথ ‘হরমুজ প্রণালী’ অবরোধ করে। এর জবাবে মার্কিন সেনাও রণক্ষেত্রে নেমে পড়ে।

এই চরম উত্তেজনার মাঝেই হরমুজ প্রণালীর পশ্চিম অংশে আটকে পড়ে ভারতগামী ২২ থেকে ২৪টি উচ্চ অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত বাণিজ্যিক জাহাজ, যাতে বন্দি ছিলেন ৬০০ জনেরও বেশি ভারতীয় নাবিক। সামগ্রিকভাবে পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলে প্রায় ১,১০০ নাবিকসহ ৩৬ থেকে ৩৮টি ভারতীয় জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকিতে ছিল। যেহেতু ভারত তার অপরিশোধিত তেলের ৪০% এবং বাণিজ্যিক এলপিজির ৯০% এই পথেই আমদানি করে, তাই এই জাহাজগুলোর আটকে পড়া মানেই ছিল দেশের বুকে তীব্র জ্বালানি সংকট নেমে আসা।

শুরু হলো ‘অপারেশন উর্জা সুরক্ষা’
পরিস্থিতির ভয়াবহতা বুঝে ভারতীয় নৌবাহিনী তাদের ‘অপারেশন সংকল্প’-এর পরিধি বাড়িয়ে নতুন নামকরণ করে ‘অপারেশন উর্জা সুরক্ষা’। এটি ছিল ভারতীয় নৌবাহিনীর ইতিহাসের সবচেয়ে বড় এবং বিপজ্জনক মিশন। কোনো আন্তর্জাতিক জোটের ওপর ভরসা না করে, ভারত সম্পূর্ণ নিজস্ব শক্তিতে এই উদ্ধার অভিযান শুরু করে।

নৌবাহিনী একটি অভেদ্য ‘স্তরযুক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা’ তৈরি করে ওমান উপসাগর থেকে আরব সাগর পর্যন্ত আটকে পড়া জাহাজগুলোকে এসকর্ট করার সিদ্ধান্ত নেয়। অগ্রাধিকার দেওয়া হয় তেল ও গ্যাস বহনকারী ‘জ্বালানি-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ’ জাহাজগুলোকে।

সমুদ্রে ভারতের ‘ত্রিমুখী’ পরাক্রম
এই মেগা মিশন সফল করতে ভারত সমুদ্রে তার পূর্ণ শক্তি ও অত্যাধুনিক সামরিক প্রযুক্তি মোতায়েন করেছিল:

ফ্রন্টলাইন যুদ্ধজাহাজ: ওমান উপসাগর ও হরমুজ প্রণালীতে সাধারণ সময়ের চেয়ে কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিনরাত ৬-৭টি প্রথম সারির যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন রাখা হয়। এর মধ্যে ছিল ভারতের সবচেয়ে আধুনিক গাইডেড-মিসাইল ডেস্ট্রয়ার আইএনএস কলকাতা, স্টিলথ ফ্রিগেট এবং অফশোর পেট্রোল ভেসেল (ওপিভি)। এই যুদ্ধজাহাজগুলো শিবালিক, নন্দা দেবী, পাইন গ্যাস, জগ বসন্ত এবং জাগ লাড়কির মতো মেগা ট্যাঙ্কারগুলোকে নিরাপদে গুজরাটের মুন্দ্রা ও কান্দলা বন্দরে পৌঁছে দেয়।

প্রাণঘাতী মার্কোস কমান্ডো: যেকোনো ড্রোন হামলা, জিম্মি পরিস্থিতি বা জলদস্যুদের রুখতে প্রতিটি প্রধান যুদ্ধজাহাজে মোতায়েন ছিল ভারতের বিশেষ বাহিনী ‘মার্কোস’ (MARCOS)। প্রায় ১,৫০০ থেকে ২,০০০ নৌসেনা সার্বক্ষণিক যুদ্ধপ্রস্তুতি নিয়ে সমুদ্রে ছিলেন।

আকাশপথে কড়া নজরদারি: সাবমেরিন ও জাহাজ-বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্রের হুমকি রুখতে আকাশে ওড়ানো হয় আধুনিক দূরপাল্লার সামুদ্রিক পর্যবেক্ষণ বিমান পি-৮আই পোসাইডন। আকাশপথে কমান্ডো পরিবহনের জন্য প্রস্তুত ছিল সি কিং এবং এএলএইচ ধ্রুব হেলিকপ্টার। এছাড়াও, আমেরিকা থেকে কেনা অত্যাধুনিক এমকিউ-৯বি সি গার্ডিয়ান ড্রোন একটানা ৩০ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে উড়ে সরাসরি সদর দপ্তরে লাইভ ফিড পাঠাচ্ছিল।

মিশনের ঐতিহাসিক সাফল্য
চারিদিকে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের মুহুর্মুহু হুমকির মধ্যেও ভারতীয় নৌবাহিনীর ইস্পাতকঠিন নজরদারি ও অসীম সাহসিকতার কারণে শত্রুপক্ষ ভারতের কোনো জাহাজে আঁচড় কাটার সাহস পায়নি। ভারতের অর্থনৈতিক জীবনরেখা হিসেবে পরিচিত তেল ও গ্যাসবাহী প্রতিটি জাহাজকে অক্ষত অবস্থায় দেশের সীমান্তে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে।

বর্তমানে শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ায় এই গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথটি সম্পূর্ণভাবে খুলে গেছে। সফলভাবে মিশন শেষ করে আমাদের বীর যুদ্ধজাহাজ ও নৌসেনারা এখন তাদের নিয়মিত দায়িত্বে ফিরে যাচ্ছেন। ভারতীয় নৌবাহিনীর এই অভাবনীয় সাফল্য বিশ্বমঞ্চে ভারতের রণকৌশল ও সামরিক আধিপত্যকে আরও একবার প্রমাণ করল।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *