ইন্টারনেটে ইরানের থাবা! আপনার স্মার্টফোনের ডেটা কি এবার মহার্ঘ হতে চলেছে?

তেলের পর এবার কি তবে ইন্টারনেটের দখল নিতে চলেছে ইরান? হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী জাহাজের ওপর শুল্ক বসানোর পর, এবার সমুদ্রের তলদেশ দিয়ে যাওয়া ফাইবার-অপটিক কেবলের ওপর নজর পড়েছে তেহরানের। ইরানের বিপ্লবী রক্ষীবাহিনীর ঘনিষ্ঠ সংবাদ সংস্থা ‘তাসনিম’-এর একটি রিপোর্ট ঘিরে বর্তমানে বিশ্বজুড়ে তোলপাড় শুরু হয়েছে। আশঙ্কা করা হচ্ছে, ইরান যদি সমুদ্রগর্ভস্থ এই ডেটা কেবলের ওপর শুল্ক বা ‘ডিজিটাল ট্যাক্স’ আরোপ করে, তবে ভারতসহ এশিয়ার বহু দেশে ইন্টারনেট পরিষেবা কেবল ধীর নয়, বরং আকাশছোঁয়া দামি হয়ে উঠতে পারে।

কেন এই কেবলগুলো এত গুরুত্বপূর্ণ?
অনেকেই মনে করেন ইন্টারনেট স্যাটেলাইটের মাধ্যমে চলে, কিন্তু বাস্তব চিত্রটা ভিন্ন। বিশ্বের প্রায় ৯৫ থেকে ৯৭ শতাংশ ডিজিটাল ডেটা আদান-প্রদান হয় সমুদ্রের তলদেশে বিছানো ফাইবার-অপটিক কেবলের মাধ্যমে। তাসনিমের রিপোর্ট অনুযায়ী, শুধুমাত্র হরমুজ প্রণালীর নিচ দিয়ে প্রতিদিন ১০ ট্রিলিয়ন ডলারেরও বেশি আর্থিক লেনদেন সম্পন্ন হয়। ব্যাংকিং, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) এবং ক্লাউড পরিষেবার মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলো এই রুটের ওপর নির্ভরশীল।

ইরানের হাতে ইন্টারনেটের রিমোট কন্ট্রোল!
ইরান শুধু তেলের পথের পাহারাদার নয়, তারা এখন ইন্টারনেটের গ্লোবাল কন্ট্রোল সেন্টারের ওপর প্রভাব খাটাতে চাইছে। হরমুজ প্রণালীর নিচ দিয়ে ২০টিরও বেশি প্রধান কেবল গেছে, যা বিশ্বের মোট ইন্টারনেট ট্র্যাফিকের ১৭ থেকে ৩০ শতাংশ বহন করে। ইরান এখন এই রুটের ৭টি প্রধান সমুদ্রগর্ভস্থ কেবলের ওপর শুল্ক বসানোর ছক কষছে। একে বলা হচ্ছে ‘সাবমেরিন কেবল’, যা বিশেষ জাহাজের মাধ্যমে সমুদ্রের তলদেশে বসানো থাকে।

ভারতের ওপর ঠিক কী প্রভাব পড়বে?
এই বিষয়টি ভারতের ডিজিটাল অর্থনীতির জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা। খলিজ টাইমসের রিপোর্ট বলছে:

ইউরোপের সাথে ভারতের ইন্টারনেট ট্র্যাফিকের প্রায় ৬০ শতাংশ মুম্বাই এবং লোহিত সাগর (Red Sea) রুট দিয়ে যায়।

বাকি ৪০ শতাংশ যায় চেন্নাই থেকে সিঙ্গাপুর হয়ে প্রশান্ত মহাসাগর দিয়ে।

লোহিত সাগর রুটে কোনো সমস্যা হলে ভারতের UPI পেমেন্ট, অনলাইন বাণিজ্য এবং ডিজিটাল ব্যাংকিং পরিষেবা ভয়াবহভাবে ব্যাহত হতে পারে।

ভারতের ইন্টারনেট সংযোগ মূলত পাঁচটি প্রধান সিস্টেমের ওপর নির্ভরশীল— AAE-1, ফ্যালকন নেটওয়ার্ক, টাটা টিজিএন-গালফ, SEA-ME-WE 4 এবং IMEWE। এই প্রতিটি রুটই বর্তমানে উত্তপ্ত অঞ্চলের মধ্য দিয়ে গিয়েছে।

আতঙ্কে জিও-এয়ারটেল, দাম বাড়ার সম্ভাবনা প্রবল
রিলায়েন্স জিও, ভারতী এয়ারটেল এবং টাটা কমিউনিকেশনসের মতো সংস্থাগুলি ইতিমধ্যেই বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগে রয়েছে। যুদ্ধ পরিস্থিতির কথা মাথায় রেখে এই কেবলগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তারা সরকারের কাছে দরবার করেছে। যদি ইরান সত্যিই এই ডেটা কেবলের ওপর শুল্ক বসায়, তবে টেলিকম সংস্থাগুলোর খরচ কয়েক গুণ বাড়বে। আর সেই খরচের বোঝা শেষ পর্যন্ত সাধারণ গ্রাহকের ঘাড়েই চাপবে, অর্থাৎ ইন্টারনেটের রিচার্জ প্ল্যান আরও দামি হবে।

উল্লেখ্য, গত বছর লোহিত সাগরে কেবলের ক্ষতি হওয়ায় ভারতের ডেটা ট্র্যাফিকের ২৫ শতাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। এবার ইরান যদি সরাসরি নিয়ন্ত্রণের পথে হাঁটে, তবে তা বিশ্বজুড়ে ডিজিটাল যুদ্ধের রূপ নিতে পারে বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। ভারতের ডিজিটাল স্বপ্ন কি তবে সমুদ্রের তলদেশেই আটকে যাবে? উত্তর লুকিয়ে আছে আগামী কয়েক সপ্তাহের ভূ-রাজনীতিতে।