মাদুরাইতে শুরু সিপিআই(এম)-এর ২৪তম পার্টি কংগ্রেস, হিন্দুত্ববাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের বার্তা

লোকসভা নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলেও টানা তৃতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন নরেন্দ্র মোদি। এরপর একের পর এক বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির সাফল্যের আবহে, বুধবার তামিলনাড়ুর মাদুরাইতে শুরু হল সিপিআই(এম)-এর ২৪তম সর্বভারতীয় পার্টি কংগ্রেস। শহরের সীতারাম ইয়েচুরি নগরের তামাক্কাম ময়দানে ২ থেকে ৬ এপ্রিল পর্যন্ত পাঁচ দিন ধরে চলবে এই সম্মেলন।

সম্মেলনের প্রথম দিনে বামফ্রন্টের চেয়ারম্যান বিমান বসু লাল পতাকা উত্তোলন করে কংগ্রেসের সূচনা করেন। এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন কেরলের মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়ন, দলের প্রাক্তন সাধারণ সম্পাদক প্রকাশ কারাট, বৃন্দা কারাট, ত্রিপুরার প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মানিক সরকার সহ অন্যান্য প্রবীণ বাম নেতৃত্ব। এই কংগ্রেসের সভাপতিত্ব করছেন প্রবীণ বামনেতা মানিক সরকার।

সম্মেলনে দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেন নেতারা। প্রকাশ কারাট তাঁর বক্তব্যে দেশের হিন্দুত্ব ‘নিও ফ্যাসিজিম’-এর বিরুদ্ধে লড়াইয়ের বার্তা দেন। তিনি বলেন, “মাদুরাইয়ের মতো তামিল সংস্কৃতি সমৃদ্ধ শহরে এই সম্মেলন একেবারে যথার্থ। এই শহর একদিকে তামিল সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের ধারক, অন্যদিকে আট দশকেরও বেশি সময় ধরে এখানে খেটে খাওয়া মানুষ ও কমিউনিস্টদের আন্দোলন চলেছে।”

দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে ‘সঙ্কটের সময়’ উল্লেখ করে কারাট বলেন, এই পার্টি কংগ্রেসের প্রস্তুতি শুরু করেছিলেন প্রয়াত সাধারণ সম্পাদক সীতারাম ইয়েচুরি। আগামী দিনে দল কীভাবে কাজ করবে, তা ঠিক করবে এই পার্টি কংগ্রেস। তিনি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে তিনটি প্রশ্ন করেন – “কে নিজেকে ডোনাল্ড ট্রাম্পের বন্ধু বলে দাবি করে? কে গৌতম আদানি ও মুকেশ অম্বানির কাছের মানুষ? আরএসএসের প্রতি কারা সম্পূর্ণ আনুগত্য স্বীকার করে?” এরপর নিজেই উত্তর দেন, “এই তিনটি প্রশ্নের উত্তরই এক, নরেন্দ্র মোদি ও বিজেপি। এই বিজেপি-আরএসএস এবং কর্পোরেট হিন্দুত্ব জোটের বিরুদ্ধে লড়তে হবে এবং তাদের পরাজিত করতে হবে।” তিনি আরও বলেন, হিন্দুত্ব বাহিনী শুধুমাত্র নির্বাচনী প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই নয়, আদর্শ, সংস্কৃতি ও সামাজিক দিক থেকেও আধিপত্য বিস্তার করছে এবং গণতন্ত্র ও সংবিধানের উপর কর্তৃত্ব ফলাচ্ছে।

এই অবস্থায় বিজেপিকে রুখে দাঁড়াতে বাম দলগুলিই সক্ষম বলে মন্তব্য করেন প্রকাশ কারাট। তিনি বলেন, “হিন্দুত্বের নিও-ফ্যাসিজিমের বিরুদ্ধে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারে বামেরা। তাদের সেই আদর্শ রয়েছে। শুধুমাত্র বামেরাই দেশের এই সাম্রাজ্যবাদী ধরনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে পারে। দেশে একটি গণতান্ত্রিক বিকল্প হবে লেফট-উইং। সেই লক্ষ্যে সিপিআই(এম) সব বামদলগুলিকে নিয়ে কাজ করবে।”

সভাপতির ভাষণে ত্রিপুরার প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মানিক সরকার বলেন, ডোনাল্ড ট্রাম্প আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর বিশ্বে সাম্রাজ্যবাদ আরও প্রকট হয়েছে এবং আগামী দিনে পরিস্থিতি আরও টালমাটাল হতে পারে। তিনি মোদি সরকারের ১১ বছরের শাসনকালে ‘হিন্দু-কর্তৃত্ব’ দেখেছেন বলে মন্তব্য করেন। মানিক সরকার আরও বলেন, দেশের বিশাল সংখ্যক সাধারণ মানুষ বেকারত্ব, মূল্যবৃদ্ধি, কৃষি সমস্যা ও দুর্নীতির মতো সমস্যায় জর্জরিত এবং সংখ্যালঘুদের উপর পদ্ধতিগতভাবে নিপীড়ন চলছে। এই পার্টি কংগ্রেসে ধর্মনিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক শক্তি জোটবদ্ধ হয়ে বিজেপি-আরএসএস-এর বিরুদ্ধে লড়াই করবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

সর্বভারতীয় পার্টি কংগ্রেস সিপিআই(এম)-এর সর্বোচ্চ নীতি-নির্ধারক নেতৃত্ব। সাধারণত প্রতি তিন বছরে একবার কেন্দ্রীয় কমিটি এই কংগ্রেসের আয়োজন করে। এই সম্মেলনে বিদায়ী কেন্দ্রীয় কমিটি একটি নতুন কেন্দ্রীয় প্যানেলের প্রস্তাব দেবে এবং সেখান থেকে পলিটব্যুরোর সদস্যদের নির্বাচিত করা হবে। গত বছর সীতারাম ইয়েচুরির প্রয়াণের পর ফাঁকা থাকা সাধারণ সম্পাদকের পদও এই পার্টি কংগ্রেসে পূরণ করা হবে বলে আশা করা যাচ্ছে। বর্তমানে অন্তর্বর্তী কো-অর্ডিনেটরের দায়িত্ব সামলাচ্ছেন প্রকাশ কারাট।