চোখের পলকে তলিয়ে গেল ৪৩টি পরিবার! গঙ্গার ভয়াল গ্রাসে মুহূর্তে মানচিত্র থেকে মুছে গেল আস্ত গ্রাম?

শ্রাবণের শেষ মুহূর্তে এসে বাংলার এক প্রান্তে নেমে এল চরম বিপর্যয়। উত্তর ভারতের প্রবল বৃষ্টির জেরে ফুলেফেঁপে ওঠা গঙ্গার জলস্তর গত দু’দিন ধরে কমতে শুরু করতেই তার রূপ আরও ভয়ংকর হয়ে উঠেছে। জল কমার সঙ্গে সঙ্গেই শুরু হয়েছে তীব্র ভাঙন। রবিবার সকাল ছ’টা থেকে রতুয়া-১ নম্বর ব্লকের মহানন্দটোলা গ্রাম পঞ্চায়েতের জিতুটোলা গ্রামে গঙ্গার ভয়াল গ্রাসে মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ভিটেমাটি হারিয়েছেন অন্তত ৪৩টি পরিবার। নদীর গর্ভে তলিয়ে গেছে চাষের জমি, আমবাগান, বাঁশঝাড় ও বহু ঘরবাড়ি। আকস্মিক এই বিপর্যয়ে আতঙ্কিত হয়ে নিজেদের ঘর ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে পথে নেমেছেন সর্বস্বহারা মানুষ।
স্থানীয়দের অভিযোগ, গত কয়েক দিন ধরে অল্পস্বল্প ভাঙন দেখা দিলেও রবিবার সকাল ছ’টা নাগাদ আচমকাই তার তীব্রতা বহুগুণ বেড়ে যায়। সকাল এগারোটা পর্যন্ত টানা পাঁচ ঘণ্টা ধরে চলে এই ভাঙন তাণ্ডব। গ্রামের দূরত্বে থাকা গঙ্গা এক দিনের ভাঙনেই সোজা ঢুকে পড়েছে জনবসতির মধ্যে। চোখের সামনে নিজেদের জমি ও পাকা বাড়ি নদীতে তলিয়ে যেতে দেখে কার্যত দিশেহারা হয়ে পড়েন গ্রামবাসীরা। সঞ্জয় পোদ্দার ও সুপ্রিয়া স্বর্ণকারদের মতো ক্ষতিগ্রস্তদের আক্ষেপ, দীর্ঘ দিন ধরে গঙ্গার ভাঙনের আশঙ্কার কথা প্রশাসনকে বারবার জানানো হলেও কোনও স্থায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। কোথাও সামান্য বালির বস্তা ফেলা হলেও তাতে নদীর স্রোত আটকায়নি। এত দ্রুত সর্বস্ব গ্রাস করেছে যে ঘর থেকে খাবারটুকুও বার করার সুযোগ পাননি কেউ।
সবচেয়ে মর্মান্তিক অভিজ্ঞতা গোপাল মণ্ডল ও বৃদ্ধা বিমলা স্বর্ণকারের। গোপালের দু’বিঘা জমি, গোয়ালঘর, পাকা ও খড়ের বাড়ি চোখের নিমেষে গঙ্গায় তলিয়ে গেছে। বাড়িতে অসুস্থ রোগী ও গবাদি পশু নিয়ে তিনি এখন চরম অনিশ্চয়তার মুখে। অন্যদিকে, ছোট ছেলেকে আগেই গঙ্গায় হারানোর পর রবিবার সকালে নিজের চারটি খড়ের ঘরও হারিয়েছেন বৃদ্ধা বিমলা। বন্ধ হয়ে থাকা ভাতা ও বিশেষভাবে সক্ষম ছেলেকে নিয়ে এখন খোদ মাথা গোঁজার ঠাঁই কোথায় মিলবে, সেই প্রশ্নই কাঁদছে তাঁর দু’চোখে। শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে স্থানীয় স্কুলেই আশ্রয় নেওয়ার কথা ভাবছেন তাঁরা।
রবিবার দুপুরে ভাঙনের খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছয় প্রশাসন ও এনডিআরএফের দল। শুরু হয় বিপন্ন পরিবারগুলিকে নিরাপদ জায়গায় সরানোর কাজ। জেলাশাসক রাজনবীর সিংহ কপূর জানিয়েছেন, পরিস্থিতির উপর সম্পূর্ণ নজর রাখা হচ্ছে এবং দুর্গত এলাকায় দ্রুত সরকারি ত্রাণ পৌঁছে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সেচ দফতরের ইঞ্জিনিয়ারেরাও এলাকা পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপের আশ্বাস দিয়েছেন। তবে স্থানীয় বিধায়ক বা সাংসদের কাছ থেকে কোনও প্রতিক্রিয়া মেলেনি। প্রশাসনের এই আশ্বাসের পর সাময়িক ত্রাণের ব্যবস্থা হলেও, সর্বস্ব হারানো জিতুটোলার মানুষের একটাই দাবি—স্থায়ী পুনর্বাসন এবং জীবিকা ফেরানোর নিশ্চয়তা। কারণ ভাঙন এখনও পুরোপুরি থামেনি, আর তাই নদীপাড়ের প্রতিটি মানুষের মনে এখন একটাই ভয়—পরের গ্রাসটা কার বাড়ি?