১০ হাজার কোটির ক্ষতির মুখে দিল্লি! দীপাবলির মুখে রাহুলের মেগা র্যালিতে কেন গর্জে উঠলেন ব্যবসায়ীরা?

দীপাবলির আর মাত্র কয়েক দিন বাকি, ঠিক তখনই রাজধানী দিল্লির প্রাণকেন্দ্র রামলীলা ময়দানে বিরোধীদের মেগা প্রতিবাদ মিছিলে উত্তাপ চড়ছে। বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’ (INDIA)-র প্রস্তাবিত আন্দোলন ও র্যালির দিন পরিবর্তনের জন্য দিল্লির ব্যবসায়ীদের দাবি আরও জোরালো রূপ নিয়েছে। ব্যবসায়ীদের প্রাথমিক আর্জি সরাসরি খারিজ হয়ে যাওয়ার পরদিন, লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধীকে ফের দ্বিতীয় দফায় চিঠি দিল দিল্লির শীর্ষ ব্যবসায়ী সংগঠন ‘চেম্বার অফ ট্রেড অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি’ (CTI)। উৎসবের চরম মরশুমে এই বিশাল র্যালির জেরে রাজধানীর ব্যবসা বাণিজ্য পুরোপুরি লাটে ওঠার আশঙ্কা প্রকাশ করছেন তারা।
CTI-এর চেয়ারম্যান ব্রিজেশ গোয়েল কংগ্রেস সাংসদ রাহুল গান্ধীকে একটি বিস্তারিত ও জরুরি চিঠি পাঠিয়ে অনুরোধ করেছেন, আগামী ১ নভেম্বরের নির্ধারিত র্যালিটি যেন দীপাবলির পরের কোনো তারিখে পিছিয়ে দেওয়া হয়। দিল্লির ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিদের এই শীর্ষ সংগঠনের পক্ষ থেকে চিঠির একটি অনুলিপি পাঠানো হয়েছে কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গকেও, যাতে তিনি বিরোধী জোটের সহযোগী দলগুলির সঙ্গে আলোচনা করে দ্রুত একটি সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।
রাহুলের অনড় অবস্থান ও তৈরি হওয়া বিতর্ক
তবে ব্যবসায়ীদের এই আশঙ্কায় খুব একটা গলছে না বরফ। গত সোমবার সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করে রাহুল গান্ধী স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে, পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচি অনুযায়ী আগামী ১ তারিখেই রামলীলা ময়দানে বিরোধীদের বিশাল বিক্ষোভ ও র্যালি হবে। অত্যন্ত আক্রমণাত্মক সুরে তিনি দাবি করেন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী যদি মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে ‘বরখাস্ত’ করেন, তবে মাত্র ‘৩০ সেকেন্ডের মধ্যে’ এই বিক্ষোভ বন্ধ করে দেওয়া সম্ভব।
দিল্লির ব্যবসায়ীদের আশ্বস্ত করে রাহুল হিন্দিতে লেখেন, “আমরা আপনাদের ভালোবাসি এবং আপনাদের কথা শুনছি। কিন্তু বর্তমান সরকার মেট্রো বন্ধ করে দিচ্ছে, রাস্তা সিল করে দিয়ে পুরো রাজধানী লকডাউন করে রেখেছে। চুরি যাওয়া জনমতের জেরে আজ দেশে কিছুই নিরাপদ নয়—না আপনাদের দোকানপাট, না সঞ্চয়, না সন্তানদের ভবিষ্যৎ।”
১০ হাজার কোটির ক্ষতি ও ব্যবসায়ীদের গভীর আতঙ্ক
কংগ্রেস নেতৃত্বের এই অনড় অবস্থানের খবর প্রকাশ্যে আসতেই রামলীলা ময়দান সংলগ্ন প্রায় ২০টি প্রধান বাণিজ্যিক বাজারের ব্যবসায়ীদের মধ্যে চরম হতাশা ও ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। তাদের প্রধান আতঙ্ক, ১ নভেম্বরের এই মেগা সমাবেশের জেরে গোটা সেন্ট্রাল দিল্লি ব্যারিকেডে ঘিরে ফেলা হবে এবং তীব্র যানজটের কারণে দীপাবলির মুখে মূল কেনাকাটা মারাত্মকভাবে থমকে যাবে। সংগঠনের তরফে প্রশ্ন তোলা হয়েছে, “৩১ অক্টোবর থেকেই কি রাস্তা সিল করা শুরু হবে? ৩১ অক্টোবর ও ১ নভেম্বর দোকানগুলো কি আদেও খোলা থাকবে এবং ক্রেতারা কেনাকাটা করতে বাজারে পৌঁছাতে পারবেন?”
CTI-এর আনুমানিক হিসেব অনুযায়ী, ১ নভেম্বরের এই মেগা র্যালিতে প্রায় ১০ লক্ষ মানুষের জনসমাগম হতে পারে। এর জন্য অন্তত ১৫ হাজার থেকে ২০ হাজার বাস এবং রাজনৈতিক নেতাদের অসংখ্য ব্যক্তিগত গাড়ির কনভয় রাজধানীতে প্রবেশ করবে। কিন্তু রামলীলা ময়দানের চারপাশেই রয়েছে চাঁদনি চক, ভগীরথ প্যালেস, খারি বাউলি, সদর বাজার, চাওরি বাজার, কাশ্মীর গেট, নবী করীম এবং করোলবাগের মতো দিল্লির সবথেকে বড় পাইকারি ও খুচরো বাজারগুলি। ময়দানে যাতায়াতের প্রধান পথগুলি এই বাজারগুলির ওপর দিয়েই গিয়েছে।
ব্যবসায়ী সংগঠনের দাবি, গত ১০ অক্টোবর যন্তর মন্তরে মাত্র ৩ হাজার থেকে ৪ হাজার মানুষের একটি ছোট্ট বিক্ষোভে পুরো সেন্ট্রাল দিল্লি সিল হয়ে যাওয়ায় ব্যবসায়ীদের প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকার ক্ষতি সামলাতে হয়েছিল। সেখানে ১ নভেম্বর যদি ১০ লক্ষ মানুষের মহাসমাবেশ হয়, তবে পুরনো দিল্লির পুরো ব্যবসাবাণিজ্য স্তব্ধ হয়ে যাবে এবং উৎসবের মরশুমে অন্তত ১০ হাজার কোটি টাকার বিশাল লোকসানের মুখে পড়তে পারেন সাধারণ ব্যবসায়ীরা।
ব্যবসায়ীদের বিকল্প প্রস্তাব ও প্রশাসনের ভূমিকা
ব্যবসা ও ব্যবসায়ীদের স্বার্থরক্ষায় CTI-এর পক্ষ থেকে দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে:
তারিখ পরিবর্তন: ১ নভেম্বরের এই প্রস্তাবিত র্যালিটি দীপাবলির উৎসব মেটার পর সুবিধাজনক কোনো তারিখে পিছিয়ে দেওয়া হোক।
স্থান পরিবর্তন: অথবা র্যালিটি ঘনবসতিপূর্ণ রামলীলা ময়দানের পরিবর্তে শহরের বাইরের দিকে যেমন—বুড়ারি গ্রাউন্ড বা জওহরলাল নেহরু স্টেডিয়ামের মতো বড় খোলা জায়গায় স্থানান্তরিত করা হোক, যেখানে সাধারণ কেনাকাটা বা বাজারের ওপর কোনো প্রভাব পড়বে না।
উল্লেখ্য, মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবিতেই মূলত বিরোধী জোটের এই আন্দোলন। এখন দেখার বিষয়, দিল্লির লাখ লাখ ব্যবসায়ীর লাগাতার অনুনয়-বিনয় ও বিরোধিতার মুখে দাঁড়িয়ে কংগ্রেস নেতৃত্ব ১ নভেম্বরের আন্দোলনের গতিপথ বদলায় কি না।