অশ্বগন্ধা খেলেই কি লিভার-কিডনি নষ্ট হয়? নতুন বৈজ্ঞানিক গবেষণায় মিলল চাঞ্চল্যকর তথ্য!

আয়ুর্বেদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঔষধি গাছ হিসেবে পরিচিত অশ্বগন্ধা। তবে এর দীর্ঘমেয়াদী নিরাপত্তা এবং পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই নানা জল্পনা ও সংশয় ছিল সাধারণ মানুষের মনে। সম্প্রতি অশ্বগন্ধার নিরাপত্তা নিয়ে পরিচালিত একটি বৃহৎ ও পুঙ্খানুপুঙ্খ ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে। মর্যাদাপূর্ণ ‘ফ্রন্টিয়ার্স ইন মেডিসিন’ জার্নালে প্রকাশিত এই গবেষণার রিপোর্ট অনুযায়ী, নিয়মিত অশ্বগন্ধা সেবনে লিভার বা কিডনির কোনো ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা নেই বললেই চলে।

কীভাবে পরিচালিত হয়েছিল এই গবেষণা? ভারতের সাতটি খ্যাতনামা গবেষণা কেন্দ্রে এই ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালটি পরিচালিত হয়। এই গবেষণায় অংশ নিয়েছিলেন মোট ১,২০০ জন অংশগ্রহণকারী। তাঁদের দুটি ভিন্ন দলে ভাগ করা হয়েছিল:

  • একটি দলকে প্রতিদিন নির্দিষ্ট মাত্রার (৫০০ মিলিগ্রাম জেলযুক্ত অশ্বগন্ধা মূলের নির্যাস, যা ৪ গ্রাম কাঁচা অশ্বগন্ধার গুঁড়োর সমান) নির্যাস দেওয়া হয়।

  • অন্য দলটিকে হুবহু দেখতে একটি প্ল্যাসিবো (নিষ্ক্রিয় ওষুধ) দেওয়া হয়।

തുടர்ந்து ২৪ সপ্তাহ ধরে এই নিয়ম বজায় রাখা হয় এবং পরবর্তীতে ২৮ সপ্তাহ পর্যন্ত অংশগ্রহণকারীদের স্বাস্থ্য নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়। দীর্ঘ এই ট্রায়াল শেষে দেখা যায়, অংশগ্রহণকারীদের বড় একটি অংশ অর্থাৎ প্রায় ৮৬ শতাংশ সফলভাবে পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করেছেন।

লিভার ও কিডনি পরীক্ষায় কী উঠে এল? গবেষকদের মতে, ২৪ সপ্তাহ ধরে নিয়মিত প্রমিত অশ্বগন্ধা মূলের নির্যাস গ্রহণ করার পরও অংশগ্রহণকারীদের যকৃৎ (Liver) এবং বৃক্ক বা কিডনির কার্যকারিতা সম্পূর্ণ স্বাভাবিক সীমার মধ্যে ছিল। লিভার এনজাইম, বিলিরুবিন, ক্রিয়েটিনিন কিংবা ব্লাড ইউরিয়ার পরীক্ষায় চিকিৎসাজনিত কোনো ক্ষতির ন্যূনতম প্রমাণও পাওয়া যায়নি। এমনকি ট্রায়াল চলাকালীন এমন কোনো গুরুতর বিরূপ প্রতিক্রিয়া বা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়নি, যার কারণে কাউকে গবেষণা থেকে বাদ দিতে হতে পারে।

টিকার কার্যকারিতার ওপর কি কোনো প্রভাব পড়ে? এই গবেষণার আরেকটি অন্যতম প্রধান দিক ছিল কোভিশিল্ড ভ্যাকসিনের পর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার ওপর অশ্বগন্ধার প্রভাব মূল্যায়ন করা। ফলাফলে দেখা গেছে, অশ্বগন্ধা এবং প্ল্যাসিবো—উভয় গ্রুপের মধ্যেই ভাইরাসের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ার ক্ষমতা ৮৫ শতাংশের বেশি ছিল। অর্থাৎ, অশ্বগন্ধা সেবন কোনোভাবেই ভ্যাকসিনের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতায় বাধা সৃষ্টি করে না।

বিশেষজ্ঞদের মতামত ও আধুনিক বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন এই বহু-কেন্দ্রিক গবেষণায় আয়ুর্বেদ, ক্লিনিক্যাল মেডিসিন এবং রিউম্যাটোলজির মতো বিভিন্ন ক্ষেত্রের ৪৫ জন গবেষক ও নয়টি শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান অংশ নিয়েছিল। এর মধ্যে অন্যতম হলো সেন্ট্রাল কাউন্সিল ফর রিসার্চ ইন আয়ুর্বেদিক সাইন্সেস (CCRAS), অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অফ আয়ুর্বেদ (AIIA) এবং পুনের সেন্টার ফর রিউম্যাটিক ডিজিজেস।

প্রধান রিউম্যাটোলজিস্ট এবং আয়ুশ ডিস্টিংগুইশড সায়েন্টিস্ট চেয়ার ড. অরবিন্দ চোপড়া জানিয়েছেন, নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে পরিচালিত এই দীর্ঘমেয়াদী ট্রায়াল অশ্বগন্ধার সুরক্ষা ও সহনশীলতার পক্ষে অত্যন্ত জোরালো প্রমাণ হাজির করেছে। অন্যদিকে, আয়ুষ মন্ত্রকের সচিব বৈদ্য রাজেশ কোটেচা মনে করেন, এ ধরনের কঠোর ও বৈজ্ঞানিক গবেষণা আধুনিক স্বাস্থ্যসেবায় আয়ুর্বেদের সঠিক ও দায়িত্বশীল ব্যবহারকে আরও অনেক বেশি তরান্বিত করবে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *