মিষ্টির বাক্স নয়, দীপাবলির বোনাসে সোজা ১ লক্ষ টাকার ক্যাশ! সুরাটের ধনকুবের ব্যবসায়ীর কাণ্ডে হতবাক নেটদুনিয়া!

দীপাবলির বোনাস মানেই অনেকের কাছে হাতে গোনা কিছু উপহার, মিষ্টির বাক্স কিংবা সামান্য কিছু বাড়তি টাকা। কিন্তু উৎসবের এই মরশুমে গুজরাটের সুরাটের এক নামী বস্ত্র ব্যবসায়ীর এমন এক মানবিক ও অভাবনীয় উদ্যোগ সামনে এসেছে, যা দেখে কার্যত তাজ্জব বনে গিয়েছে গোটা নেটপাড়া। নিজের সংস্থার সামান্য কিছু কর্মী নয়, বরং একে একে মোট কুড়িজন কর্মীর প্রত্যেকের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে এক লক্ষ টাকারও বেশি নগদ ক্যাশ! সবমিলিয়ে এই বিশাল দীপাবলি বোনাস দিতে ওই ব্যবসায়ীর খরচ হয়েছে ২০ লক্ষ টাকারও বেশি। মালিকের এমন আকাশছোঁয়া উদারতা ও ভালোবাসার উপহার পেয়ে অফিসেই আবেগ ধরে রাখতে পারেননি কর্মীরা। কারও চোখ গলে গলে পড়েছে আনন্দের জল, কেউ আবার বিস্ময়ে কার্যত বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন!
গুজরাটের বাণিজ্যনগরী সুরাটের বস্ত্র শিল্পের সঙ্গে দীর্ঘদিনের যুক্ত বিশিষ্ট এই ব্যবসায়ীর নাম রামস্বরূপ মুন্ডে। দীপাবলি আসার বহু আগে থেকেই তিনি নিজের কারখানার বিশ্বস্ত কর্মীদের কিছু একটা আলাদা ও বড় উপহার দেওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন। সাধারণত কর্পোরেট দুনিয়ায় উৎসবের সময় কর্মীদের একরত্তি উপহার, ডেরাই ফ্রুটস বা সংস্থার নির্দিষ্ট গণ্ডির বোনাস দেওয়াটাই দস্তুর। কিন্তু সেই গতানুগতিক ধারায় না হেঁটে রামস্বরূপ এক সম্পূর্ণ অভিনব পথ বেছে নেন। তিনি তাঁর সংস্থার কুড়ি জন কর্মীর প্রত্যেকের জন্য আলাদাভাবে এক লক্ষ টাকারও বেশি নগদ অর্থের বান্ডিল প্রস্তুত করেন।
সবচেয়ে নজরকাড়া বিষয় ছিল এই বিশাল পরিমাণ অর্থ উপহার দেওয়ার কায়দাটি। ঝকঝকে রুপোলি রঙের পুজোর সুসজ্জিত থালার ওপর সাজিয়ে দেওয়া হয়েছিল নতুন নোটের বান্ডিল। থালায় ১০, ২০, ৫০, ১০০, ২০০ এবং ৫০০ টাকার চকচকে নোট নিখুঁতভাবে সাজানো ছিল। এরপর দীপাবলির উৎসবে একে একে কর্মীদের সামনে সেই রুপোলি থালা তুলে দেওয়া হয়। একসঙ্গে এত বিপুল পরিমাণ নগদ টাকা উপহার হিসেবে দেখে প্রথমে তো কর্মীরা হতবাক হয়ে যান। কিছুক্ষণের জন্য কেউ বিশ্বাসই করতে পারেননি। পরবর্তী সময়ে সেই আনন্দ আর ধরে রাখতে না পেরে অনেকে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন। ভাইরাল হওয়া একটি ভিডিওতে দেখা গিয়েছে, এক মহিলা কর্মী এই অভূতপূর্ব উপহার পাওয়ার পর চোখের জল ধরে রাখতে পারছেন না।
কিন্তু কেন কর্মচারীদের এমন রাজকীয় কায়দায় এত বড় অঙ্কের টাকা উপহার দিলেন রামস্বরূপ মুন্ডে? এর উত্তরে ব্যবসায়ী জানিয়েছেন, তাঁর কাছে কারখানার কর্মীরা শুধুই সংস্থার কোনো সাধারণ শ্রমিক বা কর্মচারী নন, বরং তাঁরা তাঁর পরিবারের অত্যন্ত আপন সদস্যের মতো। এই মানুষগুলোর অক্লান্ত পরিশ্রম, নিষ্ঠা এবং সহযোগিতার ফলেই তাঁর ব্যবসা আজকের এই বিশাল উচ্চতায় পৌঁছাতে পেরেছে। তাই দীপাবলির আনন্দকে তাঁদের পরিবারের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়াই তাঁর আসল উদ্দেশ্য ছিল। নিজের জীবনের অতীতের কঠিন সংগ্রামের দিনগুলোর কথাও ভাগ করে নেন রামস্বরূপ। তিনি জানান, তিনিও একসময় চরম দারিদ্র্যের মধ্যে বড় হয়েছেন। ফলে একটি সাধারণ পরিবারের আর্থিক অনটন আর অভাবের কষ্ট তাঁর খুব ভালোভাবেই জানা আছে। দীপাবলির মতো আলোর উৎসবে ছেলেমেয়েদের নতুন জামাকাপড় কেনা কিংবা অন্যান্য সাংসारিক প্রয়োজনে যাতে কর্মীদের কোনো অর্থনৈতিক সমস্যায় পড়তে না হয়, সেই মানবিক ভাবনা থেকেই এমন দৃষ্টান্তমূলক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি।
এই বিশেষ উপহারের নেপথ্যে রয়েছে রাজস্থানের একটি অত্যন্ত প্রাচীন পারিবারিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। ‘মামেরা’ নামে পরিচিত এই ঐতিহ্যবাহী প্রথায় মূলত কোনো মহিলার মামার বাড়ির আত্মীয়রা বিশেষ সামাজিক অনুষ্ঠানে তাকে সোনা-রুপো ও অর্থ দিয়ে আশীর্বাদ করেন। রামস্বরূপের কারখানায় কর্মরত কর্মীরা সকলেই মহিলা। তাই নিজের এই মহিলা কর্মচারীদের পরিবারের আপন বোনের মতো মনে করে সুরাটের এই ব্যবসায়ী সেই রাজস্থানি ‘মামেরা’ প্রথার আদলেই উপহার দেওয়ার এই অনন্য সিদ্ধান্ত নেন। তাঁর কাছে এটি শুধুমাত্র কোনো কোম্পানির বাৎসরিক বোনাস নয়, বরং কর্মীদের প্রতি গভীর ভালোবাসা, সম্মান ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশের এক সার্থক মাধ্যম।
ইতিমধ্যেই সুরাটের এই উদার ব্যবসায়ী ও তাঁর মহিলা কর্মীদের এই আবেগঘন মুহূর্তের একটি ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ার বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে হু হু করে ভাইরাল হয়ে গিয়েছে। ভিডিওটি প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই নেটপাড়ার সমস্ত নেটিজেনরা ওই ব্যবসায়ীর মুক্তহস্ত প্রশংসা করছেন। কেউ মন্তব্য বাক্সে লিখেছেন, “এমন বড় মনের মালিক পাওয়া সত্যিই পরম ভাগ্যের ব্যাপার।” আবার কেউ রসিকতা করে আগামী বছর সুরাটের ওই সংস্থায় চাকরি পাওয়ার প্রবল ইচ্ছাও প্রকাশ করেছেন। উৎসবের আবহে এই ঘটনা প্রমাণ করে দিল যে, খাঁটি মনুষ্যত্ব ও ভালোবাসার ছোঁয়া থাকলে কর্পোরেট দুনিয়াতেও ব্যবসার বাইরে মানুষের মন জয় করা সম্ভব।