‘আরএসএস ও বিজেপির সঙ্গে কোনো সমঝোতা নয়!’ বিস্ফোরক সাক্ষাৎকার সোনিয়া গান্ধীর, তোলপাড় দেশীয় রাজনীতি!

জাতীয় রাজনীতিতে এক বিশাল আলোড়ন ফেলে বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্ব ও রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (RSS) বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করলেন কংগ্রেসের সংসদীয় দলের নেত্রী সোনিয়া গান্ধী। তাঁর প্রকাশিতব্য আত্মজীবনী ‘বিলংগিং: আ জার্নি অব লাভ’ (Belonging: A Journey of Love)-এর শুভ মুক্তির ঠিক আগেই দেওয়া এক এক্সক্লুসিভ সাক্ষাৎকারে বর্তমান কেন্দ্র সরকার, ইন্দিরার আমলের জরুরি অবস্থা এবং ২০০৪ সালে তাঁর প্রধানমন্ত্রী না হওয়ার ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নিয়ে মুখ খুলেছেন তিনি।

বিশিষ্ট সাংবাদিক এন রাম-কে দেওয়া এক লিখিত সাক্ষাৎকারে সোনিয়া স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, দেশের গণতন্ত্র ও প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠানগুলির কাঠামোর ওপর গত ১২ বছরে অকল্পনীয় আঘাত হানা হয়েছে।

‘আরএসএস-বিজেপির সঙ্গে কোনোদিন আপস নয়’
সাক্ষাৎকারে সোনিয়া স্বীকার করেন যে, কৌশলগত কারণে এবং রাজনৈতিক সমীকরণের তাগিদে অতীতে কংগ্রেসকে এমন কিছু দলের সাথে হাত মেলাতে হয়েছে যাদের আদর্শ কংগ্রেসের নীতির সাথে পুরোপুরি মেলে না। এই ধরনের সিদ্ধান্ত তাঁকে ভেতরে ভেতরে বিচলিত করলেও তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানান, “কিন্তু একটি বিষয়ে আমি পুরোপুরি পরিষ্কার—আমরা বিজেপি এবং আরএসএস-এর সাথে কোনোদিন কোনো সমঝোতা করিনি এবং ভবিষ্যতেও কখনও করব না।”

তিনি কংগ্রেসের ধর্মনিরপেক্ষ ভাবমূর্তির পক্ষে সওয়াল করে বলেন, দলের মূল নীতি সবসময়ই ভারতের সকল নাগরিককে নির্ভয়ে নিজেদের ধর্ম পালনের সাংবিধানিক অধিকারের সুরক্ষা দিয়ে এসেছে।

‘গত ১২ বছরে গণতন্ত্রের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে’
বিজেপি চালিত কেন্দ্র সরকারকে তীব্র ভাষায় আক্রমণ করে সোনিয়া গান্ধী বলেন, “গত ১২ বছর ধরে আমাদের দেশের সামাজিক কাঠামো, আমাদের গণতন্ত্র এবং প্রশাসনিক সংস্থাগুলির অপরিসীম ক্ষতি করা হয়েছে।” তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, সরকার বদল হলেও এই সমস্ত ধ্বংস হয়ে যাওয়া গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলিকে পূর্বের জায়গায় ফিরিয়ে আনতে বিপুল সময় ও কঠোর পরিশ্রমের প্রয়োজন হবে।

তাঁর আরও গুরুতর অভিযোগ, কেন্দ্র সরকার মূলধারার সংবাদ মাধ্যম, অর্থবল এবং সমস্ত সাংবিধানিক সংস্থাকে নিজেদের দখলে নিয়ে বিরোধী দলগুলির জন্য এক অসম রাজনৈতিক লড়াইয়ের ক্ষেত্র তৈরি করেছে।

২০০৪ সালের সিদ্ধান্ত ও মানমোহন সিংহ প্রসঙ্গ
২০০৪ সালে ইউপিএ (UPA) একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার পরেও সোনিয়া কেন দেশের প্রধানমন্ত্রীর পদ গ্রহণ করেননি—এই প্রশ্ন নিয়ে আজও জলঘোলা হয়। সাক্ষাৎকার প্রদানকালে এ বিষয়ে জিজ্ঞাসা করা হলে সোনিয়া সোজাসুজি জানান, ‘যদি আমি প্রধানমন্ত্রী হতাম তবে কী হতো’—এই ধরণের চিন্তা তাঁর মনে কখনও আসেইনি।

তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ড. মানমোহন সিংহের সাথে তাঁর সম্পর্কের প্রশংসা করে সোনিয়া জানান, তাঁদের জুটি দারুণ সফল ছিল—যেখানে মানমোহন সরকার পরিচালনা করছিলেন এবং তিনি নিজে কংগ্রেস দলকে নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন।

ইন্দিরার জরুরি অবস্থা নিয়ে মন্তব্য
নিজের শাশুড়ি তথা ভারতের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর আমলে জারিকৃত ‘জরুরি অবস্থা’ (Emergency) নিয়ে কথা বলতে গিয়ে সোনিয়া জানান, জরুরি অবস্থা উঠে যাওয়ার পরেই তিনি এর পূর্ণ গুরুত্ব ও ভয়াবহতা উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন। গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ হওয়ার কথা স্বীকার করে নিয়ে তিনি জানান, তৎকালীন রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণেই সেই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। তবে পরবর্তীতে ইন্দিরা গান্ধী নিজেই সেই ভুল ও নানা অনিয়মের জন্য দেশবাসীর কাছে ক্ষমা চেয়েছিলেন এবং ১৯৭৭ সালের মার্চ মাসে নিরপেক্ষ নির্বাচন ডেকেছিলেন।

উল্লেখ্য, আগামী ১০ নভেম্বর ‘হার্পারকলিন্স ইন্ডিয়া’ (HarperCollins India)-র মাধ্যমে প্রকাশিত হতে চলেছে সোনিয়া গান্ধীর বহুল প্রতীক্ষিত আত্মজীবনীটি। বইটি প্রকাশিত হওয়ার আগেই প্রবীণ এই কংগ্রেস নেত্রীর এমন কড়া বক্তব্য দেশের রাজনৈতিক অলিন্দে এক নতুন বিতর্কের সূচনা করল।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *