মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের চেয়ার টলমল! ‘কারো ক্ষমতা নেই বাঁচানোর’, কলকাতায় দাঁড়িয়ে বেনজির হুঙ্কার বাম নেতৃত্বের

কলকাতার প্রাণকেন্দ্র ধর্মতলায় বৃহস্পতিবার এক মহা-সমাবেশের ডাক দিয়েছিল বামপন্থী দলগুলি। সিআইআর (SIR) বাতিল, মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ ও গ্রেফতারের দাবি এবং বিজেপির হাত থেকে দেশকে বাঁচাতে বৃহত্তর আন্দোলনের ডাক দেওয়া হয় এই ঐতিহাসিক মঞ্চ থেকে। সিপিএম, সিপিআই, ফরওয়ার্ড ব্লক, আরএসপি, এসইউসিআই এবং সিপিআই(এমএল) লিবারেশনের শীর্ষ নেতাদের উপস্থিতিতে যখন বিজেপি-বিরোধী মেগা ঐক্যের সুর চড়ছিল, ঠিক তখনই সিপিএম রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিমের এক বিস্ফোরক শর্তে রাজ্য রাজনীতিতে তোলপাড় শুরু হয়ে গেছে।
বিজেপিকে পরাস্ত করতে বৃহত্তম জোট গড়ার পক্ষে সওয়াল করলেও, সেই ঐক্যে অসৎ ও দুর্নীতিগ্রস্তদের কোনো স্থান নেই বলে সাফ জানিয়ে দিলেন সেলিম।
“আগে পাপস্খলন হোক, তারপর জোট!”
বক্তব্য পেশ করতে উঠে সেলিম দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানান, বিজেপি-বিরোধী লড়াইয়ে কোনো রাজনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতার অভাব সহ্য করা হবে না। সরাসরি কারও নাম না নিলেও নাম না-করে শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেসকেই তিনি খাঁড়া করলেন বলে মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা। সেলিমের কড়া মন্তব্য, “বৃহত্তম জোট গড়ে তুলতে হবে ঠিকই। কিন্তু যাঁদের বিরুদ্ধে চুরির অভিযোগ রয়েছে, যাঁরা চুরি করেছেন—তাঁদের আগে পাপস্খলন করতে হবে! তারপর ঐক্যের দড়িতে হাত দিতে হবে। আমাদের মূল লড়াইটা ভোট চুরির বিরুদ্ধে।”
সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে তিনি আরও যোগ করেন, নাম না নিয়ে যদি বার্তা স্পষ্ট হয়ে যায়, তবে আর নাম মুখে আনার প্রয়োজন নেই। রাজ্যবাসী ভালো করেই জানেন কাকে আর কেন এই বার্তা দেওয়া হয়েছে।
নির্বাচন কমিশন ও কলকাতা পুলিশকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ
SIR প্রক্রিয়াকে আরএসএসের রাজনৈতিক হাতিয়ার বলে তোপ দাগেন বাম নেতৃত্ব। ধর্মীয় মেরুকরণ এবং ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার চক্রান্তের বিরুদ্ধে সুর চড়িয়ে সেলিম প্রশ্ন তোলেন, মৃত বা স্থানান্তরিত ভোটার চিহ্নিত করার নামে কেন সাধারণ নাগরিকদের হেনস্থা করা হচ্ছে?
-
পুলিশকে হুঁশিয়ারি: বিজেপির মিছিলে সুবিধা পাইয়ে দিতে কলকাতার রাস্তা বন্ধ করার অভিযোগে তোপ দাগেন তিনি। সেই সঙ্গে জাতীয় পতাকার অবমাননা নিয়ে কলকাতা পুলিশ কমিশনারকে এফআইআর দায়ের করার চ্যালেঞ্জ জানান। পুলিশ পদক্ষেপ না করলে বাম ছাত্র-যুবরা এফআইআর করবে বলে হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়।
-
নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ দাবি: মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে নিশানা করে সেলিম স্পষ্ট বলেন, তাঁকে রক্ষা করার ক্ষমতা ভারতের কারও নেই।
১৬ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ! গর্জে উঠলেন বাম নেতারা
সমাবেশ থেকে প্রবীণ বাম নেতা বিমান বসু অভিযোগ করেন, SIR-এর নামে চক্রান্ত করে নির্বাচন কমিশনের নথি থেকেই ১৬ লক্ষ প্রকৃত ভোটারের নাম বাদ দিয়ে দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কমিশনারের গ্রেফতারি না হওয়া পর্যন্ত বামেদের এই আন্দোলন চলবে।
-
সংবিধান রক্ষার লড়াই: সিপিআই নেতা স্বপন বন্দ্যোপাধ্যায় ও ফরওয়ার্ড ব্লকের প্রতিনিধিরা দাবি করেন, বিজেপি ও আরএসএস মুক্ত সমাজ গড়তে বামপন্থীরাই একমাত্র রাজনৈতিক বিকল্প।
-
অমিত শাহকে প্রশ্ন: অমিত শাহের ‘৩ কোটি অনুপ্রবেশকারী’ দাবির রেশ টেনে এসইউসিআই নেতা তরুণ নস্কর ও আরএসপি নেতা তপন হোড় প্রশ্ন করেন, তাহলে এতদিন ধরে সেই চিহ্নিতকরণের কাজ কোথায় আটকে রয়েছে?
জেন-জি ও জেন-আলফাকে সঙ্গে নিয়ে ‘মানুষের জোট’
সমাবেশে সিপিআই(এমএল) লিবারেশনের সাধারণ সম্পাদক দীপঙ্কর ভট্টাচার্য এক নতুন রাজনীতির সমীকরণ টানেন। তিনি স্পষ্ট জানান, লড়াইটা শুধু রাজনৈতিক দলের জোট নয়, এটি সাধারণ ‘মানুষের জোট’।
দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়া “ভোট চোর, গদ্দি ছোড়” স্লোগানকে হাতিয়ার করে ইন্ডিয়া শিবিরের পাশাপাশি বামমনস্ক তরুণ প্রজন্ম, জেন-জি (Gen Z) এবং জেন-আলফা (Gen Alpha)-কে বুথ স্তরে তথ্য সংগ্রহ করে ঘরে ঘরে আন্দোলনের বার্তা পৌঁছে দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়।
সব মিলিয়ে ধর্মতলার মহাবেশ থেকে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে আন্দোলনের তীব্রতা বাড়াতে সফল হলেও, সেলিমের ‘পাপস্খলনের’ শর্তের পর মহাজোটে তৃণমূলের ভবিষ্যৎ অবস্থান নিয়ে রাজ্য রাজনীতির অন্দরে তৈরি হয়েছে এক বিশাল প্রশ্নচিহ্ন।