দীর্ঘ আইনি লড়াই চললেই কি সম্পত্তি ফিরে পাওয়ার অধিকার হারান মালিক? সুপ্রিম কোর্টের ঐতিহাসিক রায়ে ঘুম উড়েছে ভাড়াটেদের!

ভাড়াটের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী আইনি লড়াই চললেই যে বাড়ির মালিকের নিজের সম্পত্তি ফিরে পাওয়ার আইনি বা বৈধ প্রয়োজন ফুরিয়ে যায় না, এই সংক্রান্ত এক যুগান্তকারী ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রায় দিল দেশের সর্বোচ্চ আদালত। উত্তরপ্রদেশের পিলিভিটের প্রায় চার দশক পুরনো একটি বাড়িওয়ালা-ভাড়াটে বিরোধ মামলায় সুপ্রিম কোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, বিচার প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হওয়ার কারণে মালিকের আসল প্রয়োজনকে নস্যাৎ করা যায় না।
বিচারপতি সতীশ চন্দ্র শর্মা এবং বিচারপতি নোংমেইকাপাম কোতিশ্বর সিং-এর বেঞ্চ এলাহাবাদ হাইকোর্টের একটি পূর্ববর্তী রায় (যা ২০২৫ সালের মার্চ মাসে দেওয়া হয়েছিল) সম্পূর্ণ খারিজ করে দিয়েছে এবং নিম্ন আদালতের দেওয়া মূল উচ্ছেদের নির্দেশই পুনর্বহাল করেছে। আদালতের কড়া নির্দেশ, রায়দানের ৩০ দিনের মধ্যে ভাড়াটেকে বাড়ি খালি করে মালিকের হাতে হস্তান্তর করতে হবে এবং সমস্ত বকেয়া ভাড়ার টাকাও মিটিয়ে দিতে হবে।
৪ দশকের আইনি লড়াই ও মামলার নেপথ্য কাহিনি
মামলার বিবরণ অনুযায়ী, ১৯৮৪ সালের জুলাই মাসে সংশ্লিষ্ট সম্পত্তিটির মালিকানা লাভ করেছিলেন বাড়ির মালিক। এর পর ‘উত্তরপ্রদেশ আরবান বিল্ডিংস অ্যাক্ট, ১৯৭২’-এর নিয়ম মেনে বাড়িটি খালি করার জন্য নোটিশ দেওয়া হয়। কিন্তু ১৯৮৮ সালে কর্তৃপক্ষের সামনে প্রতিশ্রুতি দেওয়া সত্ত্বেও ভাড়াটে সেই নির্দেশ অমান্য করে জবরদখল বজায় রাখেন।
অবশেষে ২০১০ সালে আইনি পথে উচ্ছেদের প্রক্রিয়া শুরু করেন মালিক। তাঁর মূল যুক্তি ছিল, তাঁর পুত্র একজন পেশাদার নিউরোসার্জন (Neurosurgeon), এবং তাঁর নিজস্ব একটি মেডিকেল ক্লিনিক খোলার জন্য ওই জায়গার অত্যন্ত প্রয়োজন।
-
আইনি লড়াইয়ের মোড় ঘোরানো মুহূর্ত: ২০১২ সালে উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ ও আপিল আদালত মালিকের এই আবেদনকে বৈধ বলে মেনে নিয়ে উচ্ছেদের নির্দেশ দেয়।
-
হাইকোর্টের হস্তক্ষেপ ও ধাক্কা: কিন্তু ভাড়াটিয়ার করা আপিলের প্রেক্ষিতে ২০২৫ সালের মার্চ মাসে এলাহাবাদ হাইকোর্ট সেই উচ্ছেদের নির্দেশ খারিজ করে দেয়। এর পরেই বাধ্য হয়ে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হন প্রবীণ বাড়ির মালিক।
সুপ্রিম কোর্টের কড়া পর্যবেক্ষণ ও রায়দান
এদিনের রায়ে সুপ্রিম কোর্ট জানিয়েছে, ১৯৮৪ সাল থেকে সম্পত্তিটি অর্জন করার পর কেটে গেছে দীর্ঘ ৪০ বছর। এত দীর্ঘ সময় ধরে আইনি জটে আটকে থাকায় মালিকের ছেলেও সেখানে নিজের পেশাগত ক্লিনিক তৈরি করতে পারেননি। ২০২৩ সালের একটি পূর্ববর্তী রায়ের প্রসঙ্গ টেনে শীর্ষ আদালত সাফ জানিয়েছে, এত দীর্ঘ বিলম্বের কারণে মালিককে নতুন করে আবার আইনি লড়াইয়ে ঠেলে দেওয়া সম্পূর্ণ ‘ন্যায়বিচারের পরিপন্থী’।
আদালতের সুনির্দিষ্ট নির্দেশ অনুযায়ী— ১. এলাহাবাদ হাইকোর্টের বিতর্কিত রায় খারিজ করা হচ্ছে। ২. নিম্ন আদালতের দেওয়া মূল উচ্ছেদের নির্দেশই বহাল রাখা হলো। ৩. আগামী ৩০ দিনের মধ্যে ভাড়াটেকে সম্পত্তি খালি করে মালিকের কাছে শান্তিপূর্ণভাবে তা ফিরিয়ে দিতে হবে। ৪. সেই সঙ্গেই সমস্ত বকেয়া ভাড়ার পুরো অঙ্ক এই নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই পরিশোধ করতে হবে।
বাড়িওয়ালা ও ভাড়াটের দীর্ঘদিনের এই আইনি দ্বন্দ্বে সুপ্রিম কোর্টের এই কড়া রায় দেশের অন্যান্য সম্পত্তির মামলাগুলির ক্ষেত্রেও এক বড় দৃষ্টান্ত স্থাপন করল বলেই মনে করছেন আইন বিশেষজ্ঞরা।