দেশে তৈরি প্রথম সামরিক বিমান এবার আকাশে ওড়ার অপেক্ষায়! টাটা-এয়ারবাসের যৌথ কারখানায় ইতিহাস ভারতের

প্রতিরক্ষা খাতে ভারতের আত্মনির্ভরশীল হওয়ার দীর্ঘ লড়াইয়ে এবার জুড়তে চলেছে এক ঐতিহাসিক ও গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়। কোনো সরকারি সংস্থাসংস্থার নয়, বরং দেশের মাটিতে এই প্রথম কোনো বেসরকারি কোম্পানির হাত ধরে তৈরি সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তির সি-২৯৫ (C-295) সামরিক পরিবহন বিমান খুব শীঘ্রই হাতে পেতে চলেছে ভারতীয় বিমান বাহিনী (IAF)। গুজরাটের ভদোদরায় টাটা (Tata) এবং ইউরোপীয় জায়ান্ট এয়ারবাসের (Airbus) যৌথ উদ্যোগে তৈরি এই বিমানটিকে ভারতের প্রতিরক্ষা উৎপাদনের ইতিহাসে এক বিরাট মাইলফলক হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।
সফল উড্ডয়ন ও হস্তান্তরের প্রস্তুতি
ভদোদরার অত্যাধুনিক কারখানায় উৎপাদিত প্রথম সি-২৯৫ বিমানটি গত ১০ জুন, ২০২৬ তারিখে তার প্রথম সফল উড্ডয়ন সম্পন্ন করেছিল। এরপর থেকেই বিমানটির প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ, কার্যক্ষমতা এবং নিরাপত্তা সংক্রান্ত একাধিক কড়া পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানো হয়। সমস্ত কারিগরি মূল্যায়ন ও উড্ডয়ন পরীক্ষা সফলভাবে সম্পন্ন হওয়ার পর এখন এটি ভারতীয় বিমান বাহিনীর হাতে তুলে দেওয়ার চূড়ান্ত প্রস্তুতি চলছে। যদিও আনুষ্ঠানিক হস্তান্তরের নির্দিষ্ট দিনক্ষণ এখনও ঘোষণা করা হয়নি, তবে বিশ্বস্ত সূত্রের খবর অনুযায়ী, চলতি বছরের নভেম্বর মাসের শেষ সপ্তাহের মধ্যেই বিমানটি বায়ুসেনার বহরে যুক্ত হতে পারে।
৫৬টি বিমানের মেগা চুক্তি ও উৎপাদন পরিকাঠামো
ভারতের আকাশপথের সুরক্ষা ও সামরিক রসদ পরিবহনের ক্ষমতা বহুগুণ বাড়াতে ২০২১ সালে মোট ৫৬টি সি-২৯৫ সামরিক পরিবহন বিমানের জন্য চুক্তি করেছিল ভারতীয় বিমানবাহিনী। এই মেগা প্রকল্পের চুক্তি অনুযায়ী:
-
প্রথম ১৬টি বিমান সরাসরি স্পেনে তৈরি হয়ে আসার কথা রয়েছে।
-
বাকি ৪০টি বিমান সম্পূর্ণভাবে ভারতেই টাটা ও এয়ারবাসের যৌথ উদ্যোগে তৈরি হচ্ছে।
যদিও প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী বিমানগুলি ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে সরবরাহ করার কথা ছিল, তবে কিছু অনিবার্য কারণে তা সামান্য বিলম্বিত হয়। এখন নভেম্বর মাসের শেষ সপ্তাহেই প্রথম দেশীয় বিমানটি হস্তান্তরের জোরালো সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
C-295 বিমানের তাকলাগানো বৈশিষ্ট্য
ভদোদরার কারখানায় তৈরি এই বিমানটি সামগ্রিক অর্ডারের ১৭তম ইউনিট হলেও, ভারতে তৈরি হওয়ার সুবাদে এটি দেশের সামরিক উৎপাদনে এক নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে। C-295 হলো একটি অত্যন্ত আধুনিক সামরিক পরিবহন বিমান, যার প্রধান কাজগুলি হল:
-
সৈন্য ও অস্ত্র পরিবহন: যুদ্ধক্ষেত্র বা জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সেনা জওয়ান, অস্ত্রশস্ত্র এবং সামরিক সরঞ্জাম এক স্থান থেকে অন্য স্থানে নিয়ে যাওয়া।
-
ত্রাণ ও জরুরি পরিষেবা: দুর্গম এলাকায় ত্রাণসামগ্রী পৌঁছে দেওয়া।
-
ক্ষুদ্র রানওয়েতে দক্ষতা: এর অন্যতম বড় বৈশিষ্ট্য হলো, অত্যন্ত ছোট ও কাঁচা রানওয়ে থেকেও এটি খুব সহজে উড্ডয়ন ও অবতরণ করতে সক্ষম। ফলে হিমালয়ের উচ্চতা থেকে শুরু করে দেশের যেকোনো দুর্গম ও প্রতিকূল অঞ্চলে রসদ পরিবহনে সেনাকে বড় সাহায্য করবে এই বিমান।
আত্মনির্ভর ভারতের পথে বিরাট ঘুড়ি
প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রকল্পের সবচেয়ে বড় ঐতিহাসিক দিকটি হলো—এই প্রথম ভারতে কোনো বেসরকারি সংস্থা সামরিক বিমান তৈরির মতো বড় দায়িত্ব সফলভাবে পালন করল। টাটা ও এয়ারবাসের এই সফল অংশীদারিত্ব ভবিষ্যতে বিদেশি প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ও কোম্পানির ওপর ভারতের নির্ভরতা এক ধাক্কায় অনেকটাই কমিয়ে দেবে। দেশের মাটিতেই অত্যাধুনিক প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম তৈরির এই সক্ষমতা বৃদ্ধি ভারতের বৈশ্বিক নিরাপত্তাকেও নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দেবে বলেই মনে করা হচ্ছে।