৮ হাজার কোটির মেগা প্রতিরক্ষা চুক্তি! আকাশে জ্বালানি ভরার ৬টি অত্যাধুনিক বিমান কিনতে ইজরায়েলের সঙ্গে হাত মেলাল ভারত

ভারতীয় বিমান বাহিনীর (IAF) দীর্ঘপাল্লার সামরিক অভিযান ও আকাশপথে যুদ্ধের সক্ষমতা বাড়াতে এবার এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ করতে চলেছে নরেন্দ্র মোদী সরকার। ভারত ও ইজরায়েলের মধ্যে প্রায় ৯০০ মিলিয়ন ডলার—অর্থাৎ ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ৮,০০০ কোটি টাকা মূল্যের একটি বিশাল প্রতিরক্ষা চুক্তি এখন চূড়ান্ত পর্যায়ের দোরগোড়ায় এসে পৌঁছেছে। এই মেগা চুক্তির আওতায় ইজরায়েলের রাষ্ট্রীয় প্রতিরক্ষা কোম্পানি ‘ইজরায়েল অ্যারোস্পেস ইন্ডাস্ট্রিজ’ (IAI) ভারতীয় বিমান বাহিনীকে মোট ছয়টি অত্যাধুনিক আকাশপথে জ্বালানি ভরার বিমান (Aerial Refueling Aircraft) সরবরাহ করবে।
সহজ কথায়, এই বিশেষ বিমানগুলি আকাশে উড্ডয়নরত অবস্থায় যুদ্ধবিমানে সরাসরি জ্বালানি ভরার কাজে ব্যবহার করা হয়, যা যেকোনো দীর্ঘমেয়াদী অপারেশনের ক্ষেত্রে গেম-চেঞ্জার হিসেবে প্রমাণিত হবে।
কেন একমাত্র যোগ্য দরদাতা হয়ে উঠল ইজরায়েলি সংস্থা? ইজরায়েল সরকারের প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত ‘ইজরায়েল অ্যারোস্পেস ইন্ডাস্ট্রিজ’ (IAI) হলো বিশ্বমানের মহাকাশ ও বিমান চলাচল খাতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় বৈশ্বিক নির্মাতা প্রতিষ্ঠান। সামরিক ও বেসামরিক—উভয় খাতের জন্যই উন্নত আকাশপথ ও মহাকাশ সংক্রান্ত প্রযুক্তি তৈরিতে তাদের সুদীর্ঘ সুনাম রয়েছে।
প্রতিরক্ষা মন্ত্রক সূত্রে জানা গিয়েছে, এই প্রকল্পের জন্য আন্তর্জাতিক দরপত্রে রাশিয়া ও ইউরোপের একাধিক নামী কোম্পানি তাদের প্রস্তাব জমা দিলেও তারা মূল্যায়নের কঠোর মানদণ্ড পূরণে ব্যর্থ হয়। এর ফলে একমাত্র যোগ্য দরদাতা হিসেবে চূড়ান্তভাবে উঠে আসে এই ইজরায়েলি সংস্থাটি।
বোয়িং ৭৬৭ বিমান ও ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ নীতি: চুক্তি অনুযায়ী, দরপত্রে চূড়ান্ত জয়ী হওয়ার পর IAI এই বিশেষ প্রকল্পের জন্য বোয়িং ৭৬৭ (Boeing 767) মডেলের ছয়টি বিমান সংগ্রহ করবে। সবচেয়ে বড় কথা, এই চুক্তিতে ভারতের নিজস্ব উৎপাদন নীতিকে গুরুত্ব দিয়ে ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ (Make in India) সংক্রান্ত কঠোর শর্তাবলি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এই চুক্তির আওতায় রিফুয়েলিং ট্যাঙ্কার প্রকল্পের অন্তত ৩০ শতাংশ কাজ ভারতের মাটিতেই সম্পন্ন করা হবে।
এই কাজের জন্য রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা ‘হিন্দুস্তান অ্যারোনটিক্স লিমিটেড’ (HAL)-এর ভারতীয় অংশীদার হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। কাজের পরিধির মধ্যে মূলত থাকবে স্থানীয় পর্যায়ে সিস্টেম ইন্টিগ্রেশন, ওয়্যারিং এবং অত্যাধুনিক কাঠামোগত উন্নয়ন। সমস্ত প্রয়োজনীয় আইনি ও প্রশাসনিক অনুমোদন পাওয়ার পর, ২০২৮ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে এই বিমানগুলি আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতীয় বিমান বাহিনীর হাতে তুলে দেওয়া হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
৪০ বছরের অভিজ্ঞতা ও পুরোনো রুশ বহরের বিদায়: আকাশপথে জ্বালানি ভরার উপযোগী বিমান তৈরির ক্ষেত্রে ইজরায়েল অ্যারোস্পেস ইন্ডাস্ট্রিজ (IAI)-এর ৪০ বছরেরও বেশি সুদীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে। ইতিপূর্বে তারা নিজেদের দেশের বিমানবাহিনী সহ বিশ্বের ১২টিরও বেশি দেশের জন্য বিভিন্ন যুদ্ধবিমানকে সফলভাবে রিফুয়েলিং ট্যাঙ্কারে রূপান্তর করেছে।
ভারতীয় বিমান বাহিনীর দীর্ঘদিনের পুরনো রুশ-নির্মিত ‘ইলুশিন ইল-৭৮’ (Ilyushin Il-78) বিমানবহরের স্থলাভিষিক্ত হবে এই নতুন ট্যাঙ্কার বিমানগুলি। প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, এই চুক্তি চূড়ান্ত হওয়ার ফলে আন্তর্জাতিক ও সীমান্ত সংঘাতের পরিস্থিতিতে ভারতীয় যুদ্ধবিমানগুলি নাম না নামিয়েই আকাশে ভেসে থেকে সুদীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে পারবে, যা দেশের আকাশ নিরাপত্তাকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাবে।