“বাংলায় কুস্তি, দিল্লিতে দোস্তি!” মমতার ‘লুট’ আর রাহুলের ‘দ্বিচারিতা’ নিয়ে কলকাতায় স্মৃতি ইরানির বিস্ফোরক পরমাণু বোমা

“বাংলায় কুস্তি আর দিল্লিতে দোস্তি!”—পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সুপরিচিত এই বহুচর্চিত বাক্যাংশকে ফের একবার রাজ্য রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে টেনে আনলেন বিজেপির কেন্দ্রীয় নেত্রী স্মৃতি ইরানি। মঙ্গলবার কলকাতায় এক হাই-ভোল্টেজ সাংবাদিক বৈঠকে উপস্থিত হয়ে তৃণমূল কংগ্রেস ও ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের তথাকথিত ‘ইন্ডি’ (INDIA) জোটকে কড়া ভাষায় আক্রমণ করেন বিজেপির জাতীয় সাধারণ সম্পাদক। দিল্লির মঞ্চে একাসনে বসে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও রাহুল গান্ধীর ‘রাজনৈতিক দ্বিমুখী নীতি’ এবং একে অপরের বিরুদ্ধে তোলা গুরুতর অভিযোগগুলি চেপে যাওয়া নিয়ে সরাসরি নিশানা করেছেন তিনি।

মমতা-রাহুলের ‘দ্বিচারিতা’ নিয়ে স্মৃতি ইরানির চাঁচাছোলা আক্রমণ:

সম্প্রতি প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে দিল্লিতে বিরোধীদের রামলীলা ময়দানে আয়োজিত সমাবেশের পালটা হিসেবে দেশজুড়ে ‘গণতন্ত্র বাঁচাও, অরাজকতা হটাও’ আন্দোলনে নেমেছে বিজেপি। এই কর্মসূচির অংশ হিসেবেই মঙ্গলবার কলকাতায় একটি সাংবাদিক সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। সেখানে স্মৃতি ইরানির পাশাপাশি উপস্থিত ছিলেন বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য, সাংসদ জ্যোতির্ময় সিং মাহাতো, সাধারণ সম্পাদক শশী অগ্নিহোত্রী এবং প্রধান রাজ্য মুখপাত্র দেবজিৎ সরকার।

সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও রাহুল গান্ধীর যৌথ উপস্থিতিকে ‘রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও দ্বিচারিতা’ বলে কটাক্ষ করেন স্মৃতি ইরানি। তিনি প্রশ্ন তোলেন:

  • কংগ্রেস কর্মীদের ওপর অত্যাচার: “পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূলের জমানায় মার খাওয়া কংগ্রেস কর্মীরা কেন আজ মনে করছেন যে রাজ্যে বিজেপি সরকার এলেই তাঁরা নির্ভয়ে দলীয় কার্যালয়ে যেতে পারবেন? দিল্লিতে একমঞ্চে দাঁড়িয়ে সমাবেশ করার সময় রাহুল গান্ধী কি একবারও মমতার কাছে তৃণমূলের হাতে নিগৃহীত দলীয় কর্মীদের হয়ে প্রশ্ন তুলেছেন?”

  • ‘ভাইপো’ ও ‘লুট’ বিতর্ক: ডায়মন্ড হারবারের সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম না করে তাঁকে ‘ভাইপো’ বলে সম্বোধন করেন স্মৃতি। সম্প্রতি রাজ্য পুলিশের আধিকারিকদের প্রতি অভিষেকের হুঁশিয়ারির তীব্র সমালোচনা করার পাশাপাশি তিনি অভিযোগ করেন, দিল্লিতে গিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমাণ করেছেন—তৃণমূল আগে বাংলাকে লুটেছে এবং এখন দিল্লিতেও নজর বাড়াতে চাইছে।

এসআইআর (SIR) ও নির্বাচন কমিশন বিতর্ক:

কংগ্রেস ও বিরোধী শিবিরের এসআইআর (SIR) এবং নির্বাচন কমিশনের প্রতি তোলা অভিযোগের জবাবে তথ্যের ভিত্তিতে পালটা আঘাত হানেন স্মৃতি ইরানি।

  • ইতিহাসের তথ্য তুলে তোপ: তিনি জানান, ১৯৫২ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে দেশে ১২ বার এসআইআর হয়েছে, যার মধ্যে ১০ বারই কেন্দ্রে কংগ্রেসের শাসনকালে করা হয়েছে। তামিলনাড়ুতে ৫৯ বছর এবং বিহারে ৩৬ বছর ধরে ক্ষমতায় না থাকার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, দুর্বল নেতৃত্ব ও দুর্নীতির কারণে নির্বাচনে হেরে গিয়ে কংগ্রেস আগে ইভিএম-কে দোষ দিত, আর এখন নির্বাচন কমিশনকে নিশানা করছে।

  • ১৩ কোটি নাম বাদ যাওয়ার তত্ত্ব নাকচ: বিরোধীদের ভোটার তালিকা থেকে ১৩ কোটি নাম বাদ পড়ার অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে স্মৃতি প্রশ্ন করেন, “বিএলও-রা তিনবার ঘরে ঘরে গিয়েছেন, সঙ্গে ছিলেন বিরোধীদের ২০ লক্ষ বিএলএ (BLA)। তবে কি বিরোধীরা নাম বাদ যাওয়ার দায় নিজেদের বিএলএ-দের ওপর চাপিয়ে তাঁদের দিকেই আঙুল তুলছেন?”

  • লন্ডন-পাকিস্তান যোগের তোপ: বিদেশে সাহায্য চাওয়ার বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রকের রিপোর্টের প্রসঙ্গের এড়িয়ে না গিয়ে স্মৃতি পালটা দাবি করেন, মোদী সরকারকে সরাতে রাহুল গান্ধী লন্ডনে গিয়ে সাহায্য চেয়েছেন এবং মণি শঙ্কর আইয়ার সোজা পাকিস্তানে দরবার করতে গিয়েছেন।

“ঠিকভাবে এসআইআর হলে আরও ৩০ লক্ষ নাম বাদ যেত”: শমীক ভট্টাচার্য

সাংবাদিক বৈঠকে বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যও রাজ্য সরকারকে তীব্র আক্রমণ করেন। তিনি দাবি করেন, “বাংলায় যদি ঠিকভাবে এবং নিরপেক্ষভাবে এসআইআর করা যেত, তবে ভুয়ো ও অবৈধ ভোটার হিসেবে আরও অন্তত ৩০ লক্ষের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়ত।”

জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে দিল্লিতে মমতা ও রাহুলের একমঞ্চে আন্দোলনকে কটাক্ষ করে শমীক প্রশ্ন করেন, “দিল্লিতে গিয়ে হাতে হাত মিলিয়ে আন্দোলন করলেও এই বাংলায় প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও প্রদেশ কংগ্রেসের শীর্ষ নেতারা কেন একসঙ্গে পথে নামার সাহস পাচ্ছেন না?”

কলকাতার মাটি থেকে স্মৃতি ইরানি ও শমীক ভট্টাচার্যের এই সুনির্দিষ্ট ও আক্রমণাত্মক তোপ আগামী বিধানসভা ও লোকসভা উপনির্বাচনের আগে বিরোধী জোটের ফাটলকেই ফের স্পষ্ট করে দিল বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল।

Rick Sarkar
  • Rick Sarkar

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *