পরমাণু যুদ্ধের মহাপ্রলয় শুরু? নাগরিকদের প্রাণ বাঁচাতে ৮ মিনিটের নির্দেশিকা প্রকাশ করল ইরান, তীব্র আতঙ্ক বিশ্বজুড়ে

পশ্চিম এশিয়ার আকাশ কি তবে এক ধ্বংসাত্মক পরমাণু যুদ্ধের মেঘে ঢেকে যেতে চলেছে? আমেরিকার সঙ্গে চরম সামরিক উত্তেজনার পারদ চড়তে থাকার মাঝেই এক অভাবনীয় ও চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটল মধ্যপ্রাচ্যে। আমেরিকার সম্ভাব্য বিমান ও সামরিক হামলার জল্পনার মধ্যেই এবার নিজ দেশের নাগরিকদের পরমাণু বিস্ফোরণ ও তেজস্ক্রিয় প্রভাব থেকে বাঁচার জন্য বিস্তারিত জরুরি নির্দেশিকা প্রকাশ করল ইরান!

কেবল সাধারণ সতর্কবার্তা দিয়েই ক্ষান্ত থাকেনি ইরান প্রশাসন; পরমাণু হামলা হলে কীভাবে জীবন বাঁচাতে হবে, কোথায় আশ্রয় নিতে হবে এবং শরীরে তেজস্ক্রিয় কণা প্রবেশ করা থেকে কীভাবে রক্ষা পেতে হবে—তা প্রাঞ্জলভাবে বোঝাতে প্রায় আট মিনিটের একটি বিশেষ ভিডিও নির্দেশিকা তৈরি করা হয়েছে। ইরানের সরকারি সংবাদমাধ্যম IRNA-তে প্রকাশিত এই ভিডিও সামনে আসতেই আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক মহলে হাড়হিম করা আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।

কেন হঠাৎ পরমাণু যুদ্ধের এই চরম প্রস্তুতি?

ইরানের এই ভয়াবহ নির্দেশিকা প্রকাশের সময়টিকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক কূটনীতিবিদরা। বিশেষ করে ইরানের গভীরে অবস্থিত পরমাণু পরিকাঠামো নাতানজের কাছে ভূগর্ভস্থ ‘পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন’ (Pickaxe Mountain)-এ মার্কিন হামলার সম্ভাবনা নিয়ে বিশ্বজুড়ে জোর জল্পনা চলছে। সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ওই এলাকায় সামরিক হামলার আশঙ্কার কথা ইঙ্গিত করেছিলেন, যদিও তিনি সরাসরি পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের কথা অস্বীকার করেন।

অন্যদিকে, প্রখ্যাত মার্কিন সাংবাদিক টাকার কার্লসন দাবি করেছেন যে, ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু নাকি ইরানের বিরুদ্ধে সরাসরি পারমাণবিক আঘাত হানার জন্য ট্রাম্পের ওপর চরম চাপ সৃষ্টি করছেন। যদিও মার্কিন প্রশাসনের তরফে আনুষ্ঠানিকভাবে পারমাণবিক হামলার কোনো ঘোষণা করা হয়নি, তবুও ইরানের ইসফাহান প্রদেশের (নাতানজ পরমাণু কেন্দ্রের সন্নিকটে) জরুরি পরিষেবা বিভাগ কর্তৃক এই জাতীয় ভিডিও প্রকাশ মার্কিন সংঘাতের মারাত্মক মোড় নেওয়ারই ইঙ্গিত দিচ্ছে।

পরমাণু বিস্ফোরণ ঘটলে প্রথমেই কী করতে হবে? (জরুরি নির্দেশাবলী)

ইরানের জরুরি পরিষেবা বিভাগের প্রকাশিত ভিডিওতে পরমাণু বিস্ফোরণের ৪টি প্রধান মারাত্মক বিপদের কথা তুলে ধরা হয়েছে—তীব্র আলোর ঝলকানি, ব্লাস্ট ওয়েভ বা অভিঘাত, প্রচণ্ড উত্তাপ এবং তেজস্ক্রিয় ছাই বা পারমাণবিক ফালআউট।

নির্দেশিকায় বলা হয়েছে:

  • আলোর দিকে তাকাবেন না: বিস্ফোরণের তীব্র আলোর দিকে ভুলেও সরাসরি তাকানো যাবে না, এতে অন্ধত্বের ঝুঁকি থাকে।

  • মাটিতে শুয়ে মাথা ঢাকুন: খোলা জায়গায় থাকলে এবং অবিলম্বে বাড়িতে ঢোকার সুযোগ না থাকলে কোনো শক্ত আড়ালের পেছনে মাটিতে উপুড় হয়ে শুয়ে মাথা ও মুখ ঢেকে রাখতে হবে।

  • ছবি বা ভিডিও তোলা সম্পূর্ণ নিষেধ: বিস্ফোরণের অভিঘাত কেটে যাওয়ার পর দ্রুত কোনো শক্তপোক্ত দালানে ঢুকতে হবে। কখনোই কৌতূহলবশত ছবি বা ভিডিও তোলার চেষ্টা করা যাবে না। গাড়ির ভেতরে আশ্রয় নেওয়াও মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ।

কেন বন্ধ রাখতে হবে এসি (AC) ও জানলা-দরজা?

ইরানের নির্দেশিকায় প্রতিটি পরিবারকে বাড়ির একেবারে ভেতরের অংশে বা বেসমেন্টে আশ্রয় নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। জানলা ও বাইরের দেয়াল থেকে দূরে থাকার পাশাপাশি ঘরের সমস্ত দরজা-জানলা শক্ত করে বন্ধ রাখতে বলা হয়েছে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ হলো, বাড়ির সমস্ত এয়ার কন্ডিশনার (AC) বা বাইরে থেকে বাতাস টানে এমন ভেন্টিলেশন সিস্টেম অবিলম্বে বন্ধ করে দেওয়া। কারণ, পরমাণু বিস্ফোরণের পর বাতাসের সঙ্গে বিষাক্ত ও ক্ষতিকারক তেজস্ক্রিয় কণা ভেসে বেড়ায়। এসি চালু থাকলে ওই প্রাণঘাতী কণা সহজে ঘরের ভেতর ঢুকে শ্বাসপ্রশ্বাসের সঙ্গে মানবদেহে প্রবেশ করতে পারে।

ব্যাটারিচালিত রেডিও ও ২৪ ঘণ্টার ঘরবন্দি জীবন

ভিডিওতে নাগরিকদের টানা অন্তত ২৪ ঘণ্টা ঘরবন্দি থাকার মানসিক ও শারীরিক প্রস্তুতি নিতে বলা হয়েছে। প্রতি ঘরে বোতলজাত পানীয় জল এবং শুকনো প্যাকেটজাত খাবার মজুত রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

এছাড়া, পরমাণু বিস্ফোরণের ফলে সৃষ্ট ইলেকট্রোম্যাগনেটিক পালস বা EMP-র প্রভাবে দেশের সমস্ত ডিজিটাল যোগাযোগ ব্যবস্থা, মোবাইল টাওয়ার ও আধুনিক ইলেকট্রনিক্স বিকল হয়ে যেতে পারে। তাই সরকারি নির্দেশ ও পরবর্তী আপডেট পাওয়ার জন্য বাধ্যতামূলকভাবে প্রতিটি পরিবারকে ব্যাটারিচালিত রেডিও (Battery-operated Radio) সঙ্গে রাখার নির্দেশ দিয়েছে ইরান সরকার।

আমেরিকার হামলার ইঙ্গিত নাকি সতর্কতামূলক মহড়া?

এই প্রশ্নই এখন গোটা বিশ্বের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ। জানা গেছে, ইরানে আয়োজিত বার্ষিক ‘প্যাসিভ ডিফেন্স উইক’-এর অংশ হিসেবেই এই প্রস্তুতিমূলক ভিডিওটি প্রকাশ করা হয়েছে। সরকারি বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি হয়তো আগাম সতর্কতামূলক পদক্ষেপ, যা বড় ধরণের যে কোনো বিপর্যয় মোকাবিলায় নাগরিকদের মানসিকভাবে প্রস্তুত রাখে। তবে পশ্চিম এশিয়ার বর্তমান অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতিতে পরমাণু বিস্ফোরণ থেকে বাঁচার এমন নজিরবিহীন গাইডলাইন বিশ্বজুড়ে এক গভীর যুদ্ধের আশঙ্কাকেই নতুন করে উসকে দিল!

Rick Sarkar
  • Rick Sarkar

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *