‘যোগাযোগ বন্ধ, অথচ আপনার ইনস্টাগ্রাম স্টোরির প্রথম দর্শক সেই এক্স!’ ডেটিং দুনিয়ার নতুন এই মারত্মক ফাঁদের নাম জানেন কি?

ফেসবুকের চ্যাটবক্স থেকে শুরু, তারপর প্রথম ডেট এবং নিয়ম করে প্রতিদিনের কথপোকথন। সম্পর্ক যখন বেশ ভালোই এগোচ্ছিল, ঠিক তখনই আচমকা ছন্দপতন! কোনো রকম পূর্বের ব্যাখ্যা ছাড়াই হঠাৎ করেই সমস্ত যোগাযোগ বন্ধ করে দিলেন আপনার সঙ্গী। ফোন নেই, মেসেজের কোনো রিপ্লাই নেই—সোজা কথায় যাকে বলে এক ঝটকায় ‘গোস্টিং’ (Ghosting)। আপনি হয়তো ভেবেই নিয়েছিলেন যে এই সম্পর্কের এখানেই ইতি।
কিন্তু আসল টুইস্ট তো এর পরেই! কিছুদিন বাদে দেখা গেল, যে মানুষটি আপনার জীবন থেকে পুরোপুরি উধাও হয়ে গিয়েছিল, সে ফের নিয়মিত আপনার ইনস্টাগ্রামের স্টোরি দেখছে, ফেসবুকের প্রতিটি পোস্টে নজর রাখছে, এমনকি লিঙ্কডইনেও প্রোফাইল চেক করছে। সরাসরি কোনো যোগাযোগ বা কথা না বলেও আপনার ডিজিটাল দুনিয়ায় যেন উপগ্রহের মতো প্রদক্ষিণ করে চলেছে সে। সম্পর্কের আধুনিক অভিধানে এই অদ্ভুত ও বিভ্রান্তিকর আচরণের নামই হলো ‘অরবিটিং’ (Orbiting)।
গোস্টিং বনাম অরবিটিং: তফাত কোথায়?
মনোবিদদের মতে, ‘গোস্টিং’ মানে তো সোজা সম্পর্ক থেকে পুরোপুরি হাওয়া হয়ে যাওয়া। কিন্তু ‘অরবিটিং’ হলো তার থেকেও এক ধাপ এগিয়ে—ডিজিটাল দুনিয়ায় আপনার চারপাশে চোরকোটায় ঘুরে বেড়ানো। এর মাধ্যমে যেন সেই ব্যক্তি বুঝিয়ে দিতে চায়, “আমি তোমার আসল জীবনে নেই ঠিকই, কিন্তু তোমার প্রতিটা খবর আমার হাতের মুঠোয় রয়েছে!”
বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, গোস্টিংয়ের থেকেও অনেক বেশি যন্ত্রণাদায়ক হলো এই অরবিটিং। কারণ গোস্টিংয়ের ক্ষেত্রে একটা সময় মানুষ ধরে নেয় যে অধ্যায়টি শেষ এবং মানুষটি চলে গেছে। কিন্তু অরবিটিংয়ের চক্রে পড়লে আপনি প্রতিদিন এক অদ্ভুত আশা ও মানসিক বিভ্রান্তির মধ্যে দিন কাটান—ও কি তবে ফের ফিরতে চায়? ও কি এখনও আমায় মিস করছে? আমার স্টোরি দেখার অর্থ কি তার মধ্যে আজও আগ্রহ রয়েছে?
কেন মানুষ এমন বিষাক্ত কাজ করে? রইল ৩টি প্রধান কারণ
মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, মানুষ কেন এই ধরনের অরবিটিং বা লুকোচুরি খেলা খেলে তার নেপথ্যে রয়েছে মূলত এই কারণগুলি:
১. ব্যাকআপ বা অপশন খোলা রাখা: অনেকেই বর্তমান সম্পর্ক শেষ করতে চায়, কিন্তু পুরনো দরজাটা সম্পূর্ণ বন্ধ করতে নারাজ। যদি নতুন কোনো জায়গায় সম্পর্ক না টেকে, তবে পুরনো অপশনে যেন নিরাপদে ফিরে আসা যায়—এই হীন মানসিকতা থেকেই তারা ডিজিটাল নজরদারি চালায়। ২. অপরাধবোধ বা গিল্ট (Guilt): হঠাৎ করে কাউকে কোনো কারণ ছাড়া গোস্টিং করার পর অনেকের অবচেতন মনে অপরাধবোধ কাজ করে। কিন্তু সরাসরি কথা বলার বা সরি বলার সাহস থাকে না। তাই স্টোরি দেখে বা লাইক দিয়ে তারা বোঝাতে চায়—“আমি খুব একটা খারাপ মানুষ নই, আমি তো সমাজেই আছি!” ৩. ইগো ও কন্ট্রোল ধরে রাখা: এটি সবথেকে বিষাক্ত বা টক্সিক কারণ। আপনার জীবনে তাঁর আর কোনো গুরুত্ব নেই জেনেই, আপনি এখনও তাঁকে নিয়ে ভাবছেন কি না বা তাঁর জন্য কষ্ট পাচ্ছেন কি না—তা দূর থেকে খতিয়ে দেখেই তারা নিজেদের ইগো স্যাটিসফাই করে।
আপনি ‘অরবিটিং’-এর শিকার হলে কীভাবে নিজেকে রক্ষা করবেন?
ডিজিটাল যুগের এই মারত্মক মানসিক ফাঁদ থেকে বেরিয়ে আসার জন্য বিশেষজ্ঞরা কিছু সহজ কিন্তু কার্যকর পরামর্শ দিচ্ছেন:
-
আগে পরিস্থিতি বুঝুন: যদি দেখেন কোনো ব্যক্তি মাসের পর মাস আপনার সঙ্গে কোনো কথা বা যোগাযোগ রাখছে না, অথচ আপনার প্রতিটি স্টোরি বা পোস্ট নিয়মিত দেখছে, তবে বুঝবেন আপনি অরবিটিংয়ের শিকার।
-
মিউট বা রেস্ট্রিক্ট করুন: নিজের মানসিক শান্তি বজায় রাখার জন্য সবচেয়ে মোক্ষম উপায় হলো তাঁকে সোশ্যাল মিডিয়া থেকে সঙ্গে সঙ্গে মিউট, রেস্ট্রিক্ট বা আনফলো করে দেওয়া।
-
হিসাব চাইতে যাবেন না: ভুলেও কখনো মেসেজ করে জিজ্ঞাসা করবেন না যে—“তুমি রোজ আমার স্টোরি দেখো কেন?” এই প্রশ্ন করা মানেই আপনি আবার স্বেচ্ছায় তার অরবিটে প্রবেশ করলেন। সে ঠিক এটাই চায়।
-
নিজেকে সময় দিন: মনে রাখবেন, যে মানুষটির আপনার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সত্যিটা বলার ন্যূনতম সাহস নেই, সে আপনার স্টোরি দেখল কি না তাতে আপনার জীবনের কিচ্ছু এসে যায় না। আপনার জীবন আপনার নিজের শর্তে ও স্টোরিতেই সুন্দর, কারও সস্তা ভিউ-এর ওপর নয়।
আধুনিক ডেটিং কালচারে প্রেম যত সহজ হয়েছে, তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে জটিল হয়েছে মনের সমীকরণগুলো। তাই গোস্টিং, অরবিটিং বা বেঞ্চিং-এর মতো এই ডিজিটাল যুগের ফাঁদগুলো থেকে সতর্ক থাকুন এবং নিজের মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন সবার আগে নিন।