‘চায়না লাইটকে বুড়ো আঙুল!’ বুনিয়াদপুরের মহিলাদের হাতের জাদুতে ৩ লক্ষ রঙিন প্রদীপ পাড়ি দিচ্ছে ভিনরাজ্যে!

আধুনিক এলইডি আলো ও বাহারি টুনি লাইটের ঝলকানি যতই বাড়ুক না কেন, উৎসবের মরশুমে মাটির প্রদীপের আবেগ ও কদর যে আজও একটুও কমেণি, তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ মিলল দক্ষিণ দিনাজপুরের বুনিয়াদপুরে। তবে সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে একসময়ের গতানুগতিক মাটির প্রদীপের রূপ বদলে এখন বাজারে চরম চাহিদা তৈরি হয়েছে রকমারি ও নকশাদার ‘ডিজাইনার রঙিন প্রদীপ’-এর।
আর এই চাহিদাকেই পুঁজি করে এলাকার মহিলাদের নিয়ে এক অভাবনীয় কর্মসংস্থানের পথ তৈরি করেছেন বুনিয়াদপুর পুরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ডের পালপাড়ার বিশিষ্ট মৃৎশিল্পী তাপস পাল। দীপাবলিকে সামনে রেখে তাঁদের হাতে তৈরি রঙিন প্রদীপের আলোয় এখন সেজে উঠতে চলেছে বাংলার পাশাপাশি ভিনরাজ্যের ঘরবাড়িও।
৩ লক্ষ রঙিন প্রদীপের হাতছানি: বুনিয়াদপুরে চলছে জোর কদমে কর্মযজ্ঞ
দীর্ঘ ২০ বছর ধরে মাটির নানা ধরনের জিনিস ও প্রতিমা তৈরির সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন মৃৎশিল্পী তাপস পাল। কালীপুজো ও দীপাবলিকে সামনে রেখে এবছর তাঁর স্টুডিওতে প্রায় ৩ লক্ষ মাটির রঙিন প্রদীপ তৈরির কাজ চলছে।
-
সুদীর্ঘ প্রস্তুতি: উৎসবের প্রায় দুই মাস আগে থেকেই তাপস পালের বাড়িতে এই মহাযজ্ঞ শুরু হয়ে যায়।
-
কাজের ধাপ: কাঁচা মাটির প্রদীপ তৈরি করা থেকে শুরু করে রোদে শুকানো, নিজের হাতে সুনিপুণ রং করা এবং ফাইনালি প্যাকেটজাত করা—প্রতিটি ধাপে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করছেন এলাকার গরিব ও উৎসাহী মহিলারা।
-
ব্যাপক চাহিদা: বুনিয়াদপুরের গণ্ডি পেরিয়ে পালপাড়ার এই রঙিন প্রদীপ পাইকারি ব্যবসায়ীদের হাত ধরে এখন পাড়ি দিচ্ছে কলকাতা, শিলিগুড়ি, আসানসোল থেকে শুরু করে প্রতিবেশী রাজ্য বিহার ও ওড়িশার বাজারেও। সাধারণ প্রদীপের তুলনায় এগুলির বাজারমূল্য কিছুটা বেশি হলেও নান্দনিক কারুকার্যের জন্য ক্রেতাদের কাছে এর কদর আকাশছোঁয়া।
স্বনির্ভরতার নতুন দিশা দেখাচ্ছেন পালপাড়ার মহিলারা
এই পুরো প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন এলাকার প্রায় ১০ থেকে ১২ জন মহিলা। সংসারের টানাপোড়েন ও আর্থিক অনটনের মাঝে এই কাজ তাঁদের মুখে ফুটিয়েছে স্বস্তির হাসি।
স্থানীয় মহিলা শিল্পী শম্পা সরকার হালদার বলেন, “আমাদের হাতে যখন সেভাবে সারা বছর কাজ থাকে না, তখন আমরা তাপসদার এখানে এই প্রদীপ তৈরির কাজ করি। এর মাধ্যমে ছেলেমেয়ের পড়াশোনার খরচ জুগিয়ে সংসার চালাতে অনেকটাই সাশ্রয় হচ্ছে। সাধারণ মাটির প্রদীপের চেয়ে এই কালারিং প্রদীপের চাহিদা বাজারে এখন অনেক বেশি।”
মৃৎশিল্পীর স্ত্রী মাধবী পাল জানান, প্রায় ১০-১২ জন মহিলা গত ৬-৭ মাস ধরে এই কাজের সঙ্গে যুক্ত থেকে নিজেদের পায়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছেন।
‘চাইনিজ লাইট হটিয়ে মাটির প্রদীপ বাঁচুক’—আর্জি শিল্পীদের
বাজারে চিনা টুনি লাইটের দাপটে মাটির তৈরি জিনিসের ঐতিহ্য একসময় মার খাওয়ার উপক্রম হয়েছিল। কিন্তু এই মৃৎশিল্পীরা হাল ছাড়েননি। বৈদ্যুতিক আলোর ভিড়ে মাটির প্রদীপের ঐতিহ্য ও পরিবেশবান্ধব সত্তাকে টিকিয়ে রাখতে তাঁরা দিনরাত পরিশ্রম করে চলেছেন।
মৃৎশিল্পী তাপস পাল আক্ষেপের সুরে বলেন, “বাজারে সস্তা চায়না লাইট ছেয়ে গেছে, যার ফলে একসময় মাটির প্রদীপের চাহিদা কমেছিল। কিন্তু আমরা ক্রেতাদের কথা মাথায় রেখে নান্দনিক কালারিং প্রদীপ নিয়ে এসেছি। আমাদের আবেদন, চায়না লাইটের ব্যবহার কমে মানুষ যেন আবার খাঁটি মাটির প্রদীপের প্রতি আগ্রহ দেখান। এর মাধ্যমে আমাদের ঐতিহ্য যেমন বাঁচবে, তেমনই এলাকার গরিব মহিলারাও দুপয়সা উপার্জনের সুযোগ পাবেন।”
আধুনিকতার ভিড়ে হারিয়ে না গিয়ে সৃজনশীলতা ও পরিশ্রমের জোরে মাটির প্রদীপের এই কামব্যাক এখন রীতিমতো অনুপ্রেরণা জোগাচ্ছে গোটা রাজ্যকে!