চৌরাস্তায় ১২ রাজ্যের হস্তশিল্পের মেলবন্ধন! মেলার স্থান বিতর্ক উড়িয়ে দিলীপের সোজা তোপ political নেতাদের

উৎসব ও পর্যটন মরশুমের মুখেই পাহাড়ের বুকে এক টুকরো মিনি ভারত! দার্জিলিংয়ের ঐতিহাসিক চৌরাস্তায় সাড়ম্বরে সূচনা হলো নবম ‘সরস মেলা’র। পঞ্চায়েত ও গ্রামোন্নয়ন দফতরের উদ্যোগে আয়োজিত এই আন্তর্জাতিক মানের মেলার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন মন্ত্রী দিলীপ ঘোষ। ২৮ অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া এই মেলা আগামী ৬ নভেম্বর পর্যন্ত চলবে।

মেলা প্রাঙ্গণে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের ঐতিহ্যবাহী হস্তশিল্প ও গ্রামীণ পণ্যের বিপুল সমাহার ঘটেছে। পশ্চিমবঙ্গসহ ভারতের মোট ১২টি রাজ্য থেকে আসা স্বনির্ভর গোষ্ঠীর মহিলারা, কারিগর ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা তাঁদের তৈরি নানান সামগ্রী প্রদর্শন ও বিক্রির জন্য নিয়ে এসেছেন। মেলায় স্থান পেয়েছে প্রায় ৩৪০টি স্টল। কাঁথা স্টিচের পোশাক, ডোকরা শিল্প, পিতলের তৈরি সামগ্রী, তসর ও সিল্ক বস্ত্র, জুটজাত পণ্য এবং সনাতনী মৃৎশিল্পের পাশাপাশি গ্রামীণ অর্গানিক নানা খাদ্যদ্রব্য ইতিমধ্যেই দেশ-বিদেশের পর্যটক ও স্থানীয় বাসিন্দাদের নজর কাড়ছে।

পাহাড়ের অর্থনীতি চাঙা করতে মেলাই মূল হাতিয়ার: দিলীপ ঘোষ

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে মন্ত্রী দিলীপ ঘোষ বলেন, “বছরের এই সময়ে দক্ষিণ ভারত থেকে শুরু করে সমগ্র পশ্চিমবঙ্গে এ ধরনের মেলার আয়োজন করা হয়। ভারত সরকারের দূরদর্শী যোজনায় সরস মেলার আয়োজন সর্বত্রই অভূতপূর্ব সাফল্য পেয়েছে। দার্জিলিংয়ের পর কলকাতা ও রাজ্যের অন্যান্য জেলাতেও পর্যায়ক্রমে সরস মেলা আয়োজিত হবে।”

তিনি আরও যোগ করেন, “এর ফলে স্থানীয় কারিগরদের পাশাপাশি স্বনির্ভর গোষ্ঠীর নারী উদ্যোক্তারা নিজেদের হাতের কাজের সরাসরি আন্তর্জাতিক বাজারমুখী প্রদর্শনী ও বিক্রির সেরা সুযোগ পান। দার্জিলিংয়ের এই চলতি পর্যটন মরশুমে প্রচুর দেশি-বিদেশি পর্যটকের সমাগম ঘটে, যা বিক্রিবাটার গতি বাড়ানোর পাশাপাশি নতুন ব্যবসায়িক মেলবন্ধন তৈরি করতে অত্যন্ত সহায়ক ভূমিকা নেবে।”

পাহাড়ের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি প্রসঙ্গ তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, “বহুদিন ধরে পাহাড়ের অর্থনীতি কিছুটা নিম্নমুখী ছিল। তাই পাহাড়ে মেলা ও স্টলের সংখ্যা যত বাড়বে, ততই সাধারণ মানুষ উপকৃত হবেন। কেবল দার্জিলিং শহরই নয়, কালিম্পং, মিরিক কিংবা কার্শিয়াংয়ের মতো এলাকাগুলিতেও যাতে পৃথক লোকাল মেলার আয়োজন করা যায়, তার জন্য জিটিএ (GTA) চেয়ারম্যানকে পরামর্শ দিয়েছি।”

চৌরাস্তায় মেলার স্থান ঘিরে রাজনীতি ও বিতর্কের আগুন

দার্জিলিংয়ের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ঐতিহাসিক চৌরাস্তায় এত বড় মেলার আয়োজন করা নিয়ে ইতিমধ্যেই স্থানীয় রাজনৈতিক মহলে বিতর্ক দানা বেঁধেছে। ইন্ডিয়ান গোর্খা জনশক্তি ফ্রন্টের সভাপতি তথা জিটিএ সদস্য অজয় এডওয়ার্ডস মেলার স্থান পরিবর্তনের দাবি জানিয়ে মন্ত্রী দিলীপ ঘোষের হাতে একটি স্মারকলিপি তুলে দেন।

অজয় এডওয়ার্ডসের অভিযোগ, চৌরাস্তার মতো উন্মুক্ত ঐতিহ্যবাহী স্থানে বিশাল মেলা ও শত শত অস্থায়ী স্টল তৈরির ফলে স্থানটির মূল নান্দনিক চরিত্র নষ্ট হচ্ছে। পাশাপাশি প্রাতঃভ্রমণকারী, প্রবীণ নাগরিক ও সাধারণ পর্যটকদের স্বাচ্ছন্দ্যে চলাচলে চরম প্রতিবন্ধকতা তৈরি হচ্ছে। তিনি চৌরাস্তার পরিবর্তে ভানু ভবন বা শহরের অন্য কোনো উন্মুক্ত মাঠে মেলাটি স্থানান্তরিত করার প্রস্তাব রাখেন।

“মেলা দেখে কষ্ট পাচ্ছেন রাজনৈতিক নেতারা”, তোপ দিলীপের

তবে অজয় এডওয়ার্ডসের এই বিরোধিতাকে এক ফুঁয়ে উড়িয়ে দিয়েছেন মন্ত্রী দিলীপ ঘোষ। কড়া ভাষায় তিনি পাল্টা মন্তব্য করেন, “এটি নিতান্তই রাজনৈতিক ফায়দা লোটার কথাবার্তা। পাহাড়ের সাধারণ মানুষ এই আনন্দময় মেলা নিয়ে বিন্দুমাত্র অসন্তুষ্ট নন, কেবল কয়েকজন রাজনৈতিক নেতা বিরোধের খাতিরে বিরোধিতা করছেন। পর্যটন কেন্দ্রগুলিতেই মেলা হওয়াটাই স্বাভাবিক নিয়ম।”

কলকাতার উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, “কলকাতার মতো মহানগরে সারা বছর ধরে ৫০টিরও বেশি বড় মেলা হলেও সাধারণ মানুষ কিন্তু বিরক্ত হন না। বরং মেলা স্থানীয়দের ব্যবসা ও আনন্দের অন্যতম বড় মাধ্যম। অতীতে কিছু রাজনৈতিক নেতা পাহাড়ি মানুষের উন্নয়নের জন্য কাজের কাজ কিছু করতে পারেননি বলেই আজ এই মেলার অভূতপূর্ব সাফল্য দেখে কষ্ট পাচ্ছেন।”

বিতর্ক ও উত্তাপের মাঝেই চৌরাস্তায় পর্যটক ও ক্রেতাদের বিপুল সমাগম এখন পাহাড়ের আনন্দকে কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

Rick Sarkar
  • Rick Sarkar

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *