প্যারিস জ্বলছে, স্তব্ধ দেশ! ম্যাক্রোঁ সরকারের মেগা ঘোষণাতেও শান্ত হচ্ছে না কেন ফ্রান্স?

জীবনযাত্রার আকাশছোঁয়া খরচ এবং পড়াশোনার বিপুল ব্যয়ের বিরুদ্ধে ছাত্রদের গড়ে তোলা আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছে পুরো ফ্রান্সে। আন্দোলনের হাত ধরে বিভিন্ন শহর ক্রমেই উত্তাল হয়ে উঠেছে। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা এই গণবিক্ষোভ কিছুটা হলেও প্রশমিত করতে শেষমেশ সুর নরম করেছে ইম্যানুয়েল ম্যাক্রোঁর প্রশাসন। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির অনলাইন প্ল্যাটফর্ম সম্পূর্ণ বদলে ফেলার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিশ্রুতি দিয়েছে ফ্রান্স সরকার।
সোমবার দেশের উচ্চশিক্ষামন্ত্রী ফিলিপ ব্যাপটিস্ট জানান, ২০২৮ সালে অনলাইন প্ল্যাটফর্মটি পুরোপুরি প্রতিস্থাপনের আগে আগামী বছর থেকেই এতে ‘উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন’ আনা হবে।
হাজার হাজার কোটির টোপ ও স্কুল সংস্কার
শুধু ভর্তি পদ্ধতির সংস্কারই নয়, আন্দোলনের গতি কমাতে শিক্ষাব্যবস্থায় বিরাট আর্থিক বরাদ্দের কথা ঘোষণা করেছেন ফরাসি মন্ত্রীরা। স্কুল ব্যবস্থার ব্যাপক পরিবর্তন করতে ৪ বিলিয়ন ইউরো (প্রায় ৪.৫ বিলিয়ন ডলার) পর্যন্ত ঋণ প্রদানের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। সেই সঙ্গে শ্রেণিকক্ষে ছাত্রসংখ্যা কমানো, আরও বেশি শিক্ষক নিয়োগ, উচ্চশিক্ষায় অতিরিক্ত আসন এবং পড়ুয়াদের জন্য বর্ধিত সরকারি অনুদান দেওয়ার কথা বলেছে সরকার। ফ্রান্সের স্কুলগুলির বেহাল দশা ও দুর্বল শিক্ষাকাঠামো নিয়ে দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভই মূলত দেশটিকে অশান্ত করে তুলেছিল।
তবে শুধুই তো শিক্ষা নয়, অনিয়ন্ত্রিত মূল্যবৃদ্ধি ও দৈনন্দিন নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের খরচ বেড়ে যাওয়ায় এই আন্দোলনে ছাত্রদের পাশাপাশি কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে পথে নেমেছিলেন লাখ লাখ শ্রমিকও। ফলে স্রেফ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জট খুললেই এই পরিস্থিতির নিষ্পত্তি হবে না; জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয় নিয়ন্ত্রণে আনাই এখন ফ্রান্স সরকারের কাছে সবথেকে বড় চ্যালেঞ্জ।
আগুনের গ্রাসে ঐতিহ্য, গ্রেপ্তার ২৪০০!
বিগত দু-তিন সপ্তাহ ধরে চলা এই তীব্র সরকার-বিরোধী আন্দোলন ফ্রান্সে রূপ নিয়েছে এক ধ্বংসাত্মক রণক্ষেত্রে। ফরাসি রাজধানী প্যারিস সহ দেশের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ শহরের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে গিয়ে রীতিমতো কালঘাম ছুটছে প্রেসিডেন্ট ইম্যানুয়েল ম্যাক্রোঁর।
পরিস্থিতি সবচেয়ে ভয়ঙ্কর রূপ নেয় গত ১৭ অক্টোবর। দফায় দফায় বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সশস্ত্র সংঘর্ষ বাধে। দোকানপাট ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে অবাধে চালানো হয় ভাঙচুর ও লুটপাট, জ্বালিয়ে দেওয়া হয় একের পর এক গাড়ি। আক্রান্ত হয়েছে বহু সরকারি ভবনও। এমনকি আন্দোলনকারীদের একাংশ মার্সেই-এর সিটি হলে জোড়পূর্বক ঢুকে পড়ে এবং লিমোজ শহরের ঐতিহাসিক উনিশ শতকের টাউন হলে আগুন ধরিয়ে দেয়। ভয়াবহ সেই আগুনে লিমোজ টাউন হলের ছাদ ও ঐতিহ্যবাহী ঘড়িঘরটি সম্পূর্ণ ধসে পড়ে। পুলিশ জানিয়েছে, হিংসাত্মক এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে দেশজুড়ে ইতিমধ্যেই প্রায় ২ হাজার ৪০০ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
আন্দোলন কি থামবে?
উত্তাল পরিস্থিতির মাঝেই লাখ লাখ মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে শান্তিময় মিছিলে অংশ নিয়েছেন। সোমবার সকালে ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়েন লেকোর্নুর সঙ্গে বৈঠকে বসেন ছাত্র প্রতিনিধিরা। বৈঠকের পর সরকারের দেওয়া কিছু প্রস্তাবকে স্বাগত জানালেও আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ডাক দিয়েছে প্রধান দুটি হাই স্কুল ছাত্র সংগঠন।
‘রেনোভো লিসেঁ’ হাইস্কুল দলের প্রতিনিধি নাথানায়েল কমবারি সংবাদমাধ্যমে স্পষ্ট জানান, “আমরা ছাত্রদের কিছু মাত্র দাবি আদায় করতে পেরেছি। কিন্তু ‘কিছু’ শব্দটার ওপর আমি বারবার জোর দিচ্ছি, কারণ সব দাবি মেটানো হয়নি।”
অন্যান্য ছাত্রনেতাদের বক্তব্য আরও কঠোর। সরকারের দেওয়া প্রস্তাবে একেবারেই সন্তুষ্ট নন বিক্ষোভকারীরা। ‘মুভমেন্ট কাশাঁ ৯৪’ সংগঠনের প্রধান নেতা ক্লেমঁ ভিয়ো ক্ষোভ উগরে দিয়ে বলেন, “আমরা সরকারের কাছ থেকে যা চেয়েছি, তার তুলনায় সামান্যই দেওয়া হয়েছে।” তিনি জানান, শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ে অন্তত ২ লাখ ৫০ হাজার অতিরিক্ত আসনের দাবি জানালেও সরকার মাত্র ১৫ হাজার আসনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। ফলে এই যসামান্য আশ্বাসে আন্দোলন থামার কোনো লক্ষণ নেই; দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত রাস্তায় নামার পরিকল্পনা জারি রাখছে ছাত্র সমাজ।