মাঝরাতে থানার ভেতরে দাউদাউ আগুন! মালখানার পুড়ে ছাই গুরুত্বপূর্ণ নথি, চাঞ্চল্যকর কান্ড মালদায়!

মাঝরাতে থানা চত্বরে হঠাৎই এক ভয়ঙ্কর অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ব্যাপক চাঞ্চল্য ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল গোটা এলাকায়। গভীর রাতে মালদার চাঁচল থানায় ভয়াবহ এই আগুন লাগার ঘটনাটি ঘটে। আগুনের লেলিহান শিখা মুহূর্তের মধ্যে গ্রাস করে নেয় থানার স্পর্শকাতর মালখানা ঘর-সহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ কক্ষ। মাঝরাতে থানার ভেতরে এমন অপ্রত্যাশিত ও বিপজ্জনক অগ্নিকাণ্ডের খবর চাউর হতেই স্থানীয় সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা তৈরি হয়েছে। প্রাথমিক অনুমান করা হচ্ছে যে, বৈদ্যুতিন গোলযোগ বা শর্ট সার্কিট থেকেই এই আগুনের সূত্রপাত হয়ে থাকতে পারে, যদিও অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ এখনও পর্যন্ত সম্পূর্ণ স্পষ্ট নয়।

ঘটনার সূত্রপাত ঘটে গভীর রাতে, যখন হঠাৎই থানার ভেতরে দাউদাউ করে আগুন জ্বলতে দেখা যায়। আগুন লাগার খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই দ্রুত তৎপরতা শুরু হয়। প্রথমে খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে দমকলের একটি মাত্র ইঞ্জিন এসে পৌঁছয়। কিন্তু আগুনের তীব্রতা এবং পরিধি এত বেশি ছিল যে একটি ইঞ্জিন দিয়ে আগুন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে দ্রুত আরও একটি দমকলের ইঞ্জিন তলব করা হয়। এরপর দমকল কর্মীদের নিরলস প্রচেষ্টা, সাহসিকতাপূর্ণ পুলিশ কর্মীদের ভূমিকা এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের দ্রুত সহযোগিতায় দীর্ঘক্ষণ লড়াইয়ের পর আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। রাতের বেলাতেই এই বিপজ্জনক দুর্ঘটনার খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন মহকুমা পুলিশ আধিকারিক (SDPO)। তিনি পুরো পরিস্থিতি সরেজমিন খতিয়ে দেখেন।

সৌভাগ্যবশত, আগুন চারদিকে ভয়াবহভাবে ছড়িয়ে পড়ার আগেই থানার কর্তব্যরত পুলিশকর্মীরা চরম বুদ্ধিমত্তা ও সাহসিকতার পরিচয় দেন। তাঁরা দ্রুততার সঙ্গে এগিয়ে এসে থানার গুরুত্বপূর্ণ ফাইল, মামলার কেস ডায়েরি, কম্পিউটার এবং অন্যান্য অত্যাবশ্যকীয় সরকারি সামগ্রী কোনো রকমে উদ্ধার করে নিরাপদ দূরত্বে বাইরে বের করে নিয়ে আসেন। এর ফলে বড় ধরনের কোনো আইনি নথি নষ্ট হওয়ার হাত থেকে রক্ষা পেয়েছে। তবে এই আকস্মিক অগ্নিকাণ্ডে থানা ভবনের ঠিক কতটা ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে এবং মালখানার ভেতরে থাকা জিনিসপত্রের সুনির্দিষ্ট আর্থিক পরিমাণ কতটা, তা এখনও প্রশাসন আনুষ্ঠানিকভাবে স্পষ্ট করেনি। থানার মতো একটি সুরক্ষিত ও সংবেদনশীল সরকারি দপ্তরের ভেতরে মাঝরাতে এমন মর্মান্তিক অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটায় স্বাভাবিকভাবেই নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে বড় প্রশ্নচিহ্ন তৈরি হয়েছে।

সাম্প্রতিক সময়ে রাজ্যজুড়ে একের পর এক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেই চলেছে। কিছুদিন আগেই কলকাতার বুকে মির্জা গালিব স্ট্রিটের একটি হোটেলে বিধ্বংসী আগুন লাগার ঘটনা ঘটেছিল, যা শহরবাসীকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল। শুধু তাই নয়, এবারের দুর্গাপুজোর উৎসবের দিনগুলোতেও রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে বড় বড় অগ্নিকাণ্ডের খবর সামনে এসেছে। বিশেষ করে গত ২০ অক্টোবর কলকাতার অত্যন্ত ব্যস্ত বাঘাযতীন মার্কেটে একটি ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছিল। মুহূর্তের মধ্যে সেই আগুন আশেপাশের অসংখ্য দোকানে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং চোখের পলকে একাধিক দোকান পুড়ে ছাই হয়ে যায়। ভরা পুজোর মরশুমে রাতারাতি সর্বস্বান্ত হতে হয় বহু সাধারণ ব্যবসায়ীকে। শেষ পর্যন্ত খবর পেয়ে দমকলের ১৫টি ইঞ্জিন দীর্ঘ প্রায় ৩ ঘণ্টার অক্লান্ত চেষ্টার পর সেই আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়েছিল।

বাঘাযতীন এবং কলকাতার চোরবাগানের মতো বড় ঘটনার পর তৎপর হয়ে নড়েচড়ে বসেছিল রাজ্য প্রশাসন ও ফায়ার সার্ভিস ডিপার্টমেন্ট। অগ্নিনিরাপত্তার কড়া বিধি লঙ্ঘন এবং গাফিলতির অভিযোগে কলকাতার তিনটি অত্যন্ত বড় ও নামী পুজো কমিটিকে শোকজ নোটিস পাঠিয়েছিল দমকল বিভাগ। এই তালিকায় নাম ছিল চেতলা অগ্রণী, বালিগঞ্জ কালচারাল এবং ত্রিধারা সম্মিলনীর মতো হেভিওয়েট পুজো কমিটিগুলির।

কোন সুনির্দিষ্ট কারণে এই নামী পুজো কমিটিগুলিকে নোটিস পাঠানো হয়েছিল, তা নিয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিস্তারিত জানানো হয়। চেতলা অগ্রণীর ক্ষেত্রে দমকলের উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন পরিদর্শন দল জানিয়েছিল যে, মণ্ডপ চত্বরে পর্যাপ্ত আলো, ফ্যান এবং এসি (AC)-র মারাত্মক অভাব রয়েছে। এছাড়াও, চেতলা অগ্রণীর মণ্ডপ সংলগ্ন এলাকায় একাধিক বেআইনি অস্থায়ী কাঠামো তৈরি করা হয়েছিল এবং সেখানে নিয়ম বহির্ভূতভাবে এলপিজি (LPG) সিলিন্ডার মজুত করে রাখা হয়েছিল, যা মারাত্মক দুর্ঘটনার কারণ হতে পারত। এই গুরুতর অভিযোগের ভিত্তিতে চেতলা অগ্রণীকে অবিলম্বে ওই সমস্ত অবৈধ অস্থায়ী কাঠামো ভেঙে ফেলার কড়া নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।

অন্যদিকে, বালিগঞ্জ কালচারালের ক্ষেত্রে মণ্ডপের অভ্যন্তরে আলোর স্বল্পতা বা কম আলো থাকার গুরুতর অভিযোগ উঠেছিল। উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন তদন্তকারী দলের পরিদর্শনে উঠে এসেছিল যে, কোনো কারণে আপদকালীন পরিস্থিতি তৈরি হলে দর্শনার্থীদের পক্ষে দ্রুত মণ্ডপ থেকে বাইরে বেরিয়ে আসা অত্যন্ত কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারত। এই ত্রুটি ধরা পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই বালিগঞ্জ কালচারালের এন্ট্রি গেট, এক্সিট গেট এবং লাগোয়া এলাকার সমস্ত ধরনের বাণিজ্যিক কার্যকলাপ তাৎক্ষণিকভাবে বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছিল দমকল বিভাগ। পুজোর মুখে এবং উৎসবের আবহে এই ধরনের নিরাপত্তা খামতি এবং পরপর থানা ও বাজারে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা রাজ্যের সামগ্রিক ফায়ার সেফটি পরিকাঠামো নিয়ে বড়সড় ভাবনায় ফেলেছে প্রশাসনিক মহলকে।

Saheli Saha
  • Saheli Saha

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *