জন্মদিনেই রহস্যময় ছবি ভাইরাল! চেনা মুখ গায়েব, নিজেকে চেনার উপায়টুকুও রাখলেন না অনির্বাণ?

এক ঝলক দেখলে চেনার উপায় নেই! পরিচিত মুখটা যেন হঠাৎ করেই কোথাও হারিয়ে গিয়েছে। ৭ অক্টোবর জন্মদিনের শুভলগ্নে নেটপাড়ায় ভেসে ওঠা একটি ছবিতে দেখা গেল একেবারে অচেনা এক মানুষকে। আর ছবিটি সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়তেই হু হু করে বাড়ছে নেটিজেনদের কৌতূহল—কে এই মানুষটি?
তিনি আর কেউ নন, বাংলা চলচ্চিত্র, থিয়েটার ও ওয়েব সিরিজের অন্যতম দাপুটে অভিনেতা, পরিচালক, গায়ক ও চিত্রনাট্যকার অনির্বাণ ভট্টাচার্য (Anirban Bhattacharya)। ১৯৮৬ সালের ৭ অক্টোবর মেদিনীপুরের মাটিতে জন্ম তাঁর। জন্মদিনে তাঁর চেহারার এমন অভাবনীয় বদল আরও একবার প্রমাণ করে দিল, চরিত্র ও চেহারার মিশেল ঘটিয়ে নিজেকে দুমড়ে-মুচড়ে নতুন করে গড়ার কাজে তিনি কতটা সিদ্ধহস্ত!
থিয়েটারের মঞ্চ থেকে ‘ড্রাকুলা স্যার’ ও বলিউডে পদার্পণ
অনির্বাণের অভিনয় জীবনের পথ চলা খুব একটা মসৃণ বা সোজা ছিল না। থিয়েটারের শক্ত ভিতের ওপর ভর করে অপর্ণা সেনের ‘আরশিনগর’ ছবির মাধ্যমে বড় পর্দায় প্রবেশ করেন তিনি। তবে ‘এগোলের চোখ’-এর বিষাণ রায়ের জটিল চরিত্রটি তাঁকে রাতারাতি দর্শকের প্রিয় করে তোলে।
এরপর একে একে ‘দুর্গা সহায়’, ‘ধনঞ্জয়’, ‘এক যে ছিল রাজা’, ‘গুমনামী’, ‘দ্বিতীয় পুরুষ’, ‘ড্রাকুলা স্যার’, ‘গোলন্দাজ’, ‘বিন্সি দা’, ‘দশম অবতার’ এবং ‘অথৈ’—অনির্বাণের সাফল্যের ঝুলিতে একের পর এক ভিন্নধর্মী কাজ যুক্ত হয়েছে। ২০২৩ সালে ‘মিসেস চ্যাটার্জি ভার্সেস নরওয়ে’ ছবির মাধ্যমে সফলভাবে হিন্দি সিনেমায় পা রাখেন তিনি। ২০২৫ সালে সুপারস্টার দেবের সঙ্গে মেগা প্রজেক্ট ‘রঘু ডাকাত’ এবং ‘পক্ষীরাজের ডিম’-এর মতো সৃষ্টিতে তাঁর দাপুটে উপস্থিতি দর্শক মনে গভীর দাগ কেটেছে।
অভিনয়ের গণ্ডি ছাড়িয়ে দক্ষ পরিচালক ও গীতিকার
অনির্বাণকে কেবল একজন অভিনেতা হিসেবে দেখলে তাঁর বহুমুখী প্রতিভাকে ছোট করা হবে। ২০২২ সালে বাদল সরকারের নাটক অবলম্বনে তিনি তৈরি করেন তাঁর প্রথম পরিচালিত ছবি ‘বল্লভপুরের রূপকথা’। ছবি পরিচালনা, চিত্রনাট্য থেকে শুরু করে গান—সব বিভাগেই নিজের মুনশিয়ানার পরিচয় দিয়ে বক্স অফিসে সাফল্য ছিনিয়ে নেন তিনি।
পরবর্তীতে ওয়েব সিরিজ ‘মন্দার’-এ তাঁর ডার্ক ক্রিয়েটিভিটি এবং ‘অথৈ’ ছবিতে ক্রিয়েটিভ ডিরেকশনের পাশাপাশি ‘বহু বহু দিন পরে’-র মতো সুপারহিট গানের কথা লিখে তিনি প্রমাণ করে দিয়েছেন যে নির্মাণের প্রতিটি জায়গায় তাঁর নিজস্ব এক স্বতন্ত্র ছাপ রয়েছে।
২০২৫-২০২৬: ফেডারেশন বিতর্ক, বয়কট এবং ‘মাস্টারমশাইয়ের শিক্ষা’
শিল্পের পাশাপাশি বিগত কয়েক বছর ধরে বিতর্কও ছায়ার মতো অনির্বাণকে অনুসরণ করেছে। ২০২৫ সালে ‘ফেডারেশন অফ সিনে টেকনিশিয়ানস অ্যান্ড ওয়ার্কার্স অফ ইস্টার্ন ইন্ডিয়া’-র সঙ্গে স্বাধীন কাজের অধিকার নিয়ে সংঘাত বাধে তাঁর। বিষয়টির সুরাহা করতে হাই কোর্টের দরজায় কড়া নাড়েন অনির্বাণ সহ কয়েকজন পরিচালক। পরবর্তীতে তাঁর কাজের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি হওয়া এবং মিউজিক ভিডিও শুটিংয়ে টেকনিশিয়ানদের বয়কটের ঘটনায় তোলপাড় হয় টলিউড।
এই বয়কট বিতর্কের জেরে ২০২৬ সালের গোড়াতেও প্রায় ছ’মাস কাজ থেকে দূরে থাকতে হয়েছিল তাঁকে। কিন্তু কটাক্ষ ও সংঘাতের মুখে দাঁড়িয়েও শান্ত ছিলেন অনির্বাণ। ফেডারেশন সভাপতি স্বরূপ বিশ্বাসের আক্রমণের জবাবে অত্যন্ত সংযত ভাষায় তিনি শুধু বলেছিলেন, “ছোটবেলায় আমার এক মাস্টারমশাই শিখিয়েছিলেন, পরিহাসের উত্তর দিতে নেই।” এই একটি বাক্যেই নিজের পরিপক্কতা স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন অভিনেতা।
পাশে দাঁড়ালেন দেব: কাজে ফিরলেন প্রিয় ‘বুম্বা’
বিতর্কের তীব্র আঁচে যখন কাজ বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল, তখন অনির্বাণের পাশে শক্ত পাথরের মতো এসে দাঁড়ান সুপারস্টার দেব। তিনি প্রকাশ্যে অনির্বাণের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তোলার আবেদন জানান। শুধু তা-ই নয়, ২০২৬ সালে নিজের নতুন পরিচালিত ছবি ‘DeSu7’-এ অনির্বাণকে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে কাস্ট করে স্পষ্ট জানিয়ে দেন—বিতর্ক যাই থাক, একজন খাঁটি শিল্পীর গ্রহণযোগ্যতা টলিউডে কখনোই শেষ হয়ে যায় না।
আজ জন্মদিনে ভাইরাল হওয়া সেই রহস্যময় ও অচেনা ছবিটি যেন অনির্বাণের পুরো জীবনেরই এক প্রতীকী রূপ। যে মানুষটাকে ছবিতে দেখে প্রথম দর্শনে চেনা যায় না, তাঁর ক্যারিয়ারও কোনোদিন একরৈখিক বা সাধারণ ছিল না। কখনও মঞ্চের চরিত্র, কখনও সিনেমার নায়ক, কখনও পরিচালক, আবার কখনও বিতর্ককে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে মাথা উঁচু করে ঘুরে দাঁড়ানো এক জেদী শিল্পী।
ছবিটা দেখে হয়তো অনেকেই থমকে গিয়ে জিজ্ঞেস করছেন—”এটা কি সত্যিই অনির্বাণ?” তাঁর দীর্ঘ ক্যারিয়ারের দিকে তাকালে মুচকি হেসে উত্তর দিতে হয়—”হ্যাঁ, ইনিই অনির্বাণ! প্রতিবার নিজেকে ভেঙে নতুন করে গড়েন বলেই তো আগের অনির্বাণকে আর খুঁজে পাওয়া যায় না।”