“নমিতার নাকটা কেটে দাও!” অনুপ কুমারের এক কথায় রাতারাতি কীভাবে নাম বদলালো ‘জন্মভূমি’র পিসিমার?

নয়ের দশকের জনপ্রিয় মেগা ধারাবাহিক ‘জন্মভূমি’ মানেই বাঙালি দর্শকের মনে নস্ট্যালজিয়ার এক গভীর অনুভূতি। আর সেই ধারাবাহিকের ‘পিসিমা’ চরিত্রটির কথা মনে পড়লেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে ঘরের চেনা কোনো প্রিয়জনের মুখ। শুধু ‘জন্মভূমি’ই নয়, রূপোলি পর্দার পাশাপাশি নাটকের মঞ্চ কাঁপানো অভিনয় এবং মহানায়ক উত্তম কুমারের অত্যন্ত স্নেহধন্য পাত্রী হিসেবে একসময়ে বাংলা বিনোদন জগতে উজ্জ্বল নক্ষত্র ছিলেন প্রবীণ অভিনেত্রী মিতা চট্টোপাধ্যায়।
তবে সাফল্যের শিখরে থাকা অবস্থাতেই হঠাৎ একদিন আলোঝলমলে গ্ল্যামার দুনিয়া থেকে নিজেকে পুরোপুরি গুটিয়ে নেন তিনি। বর্তমানে কেমন কাটছে তাঁর দিন? সম্প্রতি এক খোলামেলা সাক্ষাৎকারে নিজের জীবনের একাধিক অজানা কথা সামনে এনেছেন অভিনেত্রী।
“নমিতার নাকটা কেটে দাও!”—অনুপ কুমারের এক পরামর্শেই নাম বদল!
মিতা চট্টোপাধ্যায়ের আসল নাম ছিল নমিতা চট্টোপাধ্যায়। তবে একটি মজার ঘটনার কারণে তাঁর নাম চিরকালের জন্য বদলে যায়। ‘নীল শাড়ি’ নামক চলচ্চিত্রে প্রথমবার নায়িকা হিসেবে অভিনয় করার সুযোগ পান তিনি। কিন্তু বিপত্তি ঘটে শুটিং সেটে গিয়ে। জানা যায়, ছবির অন্যান্য বেশ কয়েকজন কলাকুশলী এমনকী পরিচারিকা চরিত্রের অভিনেত্রীর নামও ছিল নমিতা এবং সকলের পদবীও ছিল একই!
সেটে তৈরি হয় চরম বিভ্রান্তি। সেই ছবিতে মিতা চট্টোপাধ্যায়ের দাদার ভূমিকায় অভিনয় করছিলেন কিংবদন্তি অভিনেতা অনুপ কুমার। এই বিভ্রান্তি এড়াতে অনুপ কুমার মজার ছলে সেটে পরামর্শ দেন, “নমিতার নাকটা তো বেশ খাড়া, ওর নাকটাই কেটে দাও!” ব্যস, ব্যাস সেই থেকে নামের প্রথম বর্ণ ‘ন’ বাদ পড়ে রটে যায় ‘মিতা’। আর এই নামেই পরবর্তীকালে তিনি ইন্ডাস্ট্রিজুড়ে জনপ্রিয়তা লাভ করেন।
৬ দিনের কাজ গড়ায় সাড়ে ৭ বছরে!
মিতা চট্টোপাধ্যায়ের বর্ণময় অভিনয় জীবনের অন্যতম বড় মাইলফলক ছিল মেগা সিরিয়াল ‘জন্মভূমি’। কিন্তু এই সিরিয়ালে কাজ পাওয়ার পেছনেও রয়েছে এক অদ্ভুত গল্প। মাত্র ছ’দিনের সংক্ষিপ্ত একটি চরিত্র করার চুক্তি করে তিনি ফ্লোরে এসেছিলেন। কিন্তু তাঁর সাবলীল অভিনয় দর্শকের হৃদয়ে এমনভাবে দাগ কাটে যে, টানা সাড়ে সাত বছর ধরে তাঁকেই কন্টিনিউ করাতে বাধ্য হন নির্মাতারা। বাঙালির ঘরে ঘরে তিনি হয়ে ওঠেন সবার প্রিয় ‘পিসিমা’।
শৈশবেই কোনো বাধা ছাড়া তাঁর অভিনয় জগতে আত্মপ্রকাশ ঘটেছিল। ১৯৪০-এর দশকে শিশুশিল্পী হিসেবে পথচলা শুরু হয়। প্রেমেন্দ্র মিত্রের ‘হানাবাড়ি’ কিংবা ‘রামপ্রসাদ’ ছবিতে ছদ্মবেশী কালী চরিত্রে অভিনয় করে ছোটবেলাই ভূয়সী প্রশংসা কুড়োন তিনি।
নৃত্য, সঙ্গীত ও মঞ্চের বহুমুখী প্রতিভা
শুধু অভিনয় নয়, মিতা চট্টোপাধ্যায় ছিলেন বিরল বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী। কত্থক, কথাকলি, মণিপুরী এবং ভরতনাট্যম—সবকটি শাস্ত্রীয় রূপেই তালিম নিয়েছিলেন তিনি। অল বেঙ্গল ও অল ইন্ডিয়া মিউজিক কম্পিটিশনে একাধিকবার সেরার পুরস্কার জিতেছেন।
নাট্যাচার্য শিশির কুমার ভাদুড়ির কাছে অভিনয়ের তালিম নেওয়ার পাশাপাশি তাঁর সঙ্গে মঞ্চে অভিনয় করার বিরল সৌভাগ্য হয়েছিল তাঁর। অহীন্দ্র চৌধুরী, ছবি বিশ্বাস, কমল মিত্র ও নরেশ মিত্রের মতো প্রবাদপ্রতিম নক্ষত্রদের সঙ্গেও তিনি মঞ্চে কাজ করেছেন। ক্লাসিক্যাল সঙ্গীতে বারবার প্রথম হওয়ার পাশাপাশি কীর্তনে সেরা হয়ে জিতে নিয়েছিলেন ‘রুপোর বীণা’ পুরস্কার।
কেন হঠাৎ অভিনয়কে চিরতরে বিদায় জানালেন?
সাফল্য ও জনপ্রিয়তার মধ্যগগনে থাকা সত্ত্বেও কেন হঠাৎ অভিনয় ছেড়ে দিলেন? প্রশ্নটি করা হলে মিতা চট্টোপাধ্যায় অত্যন্ত স্পষ্ট ও শান্ত গলায় জানান, “আমিই নিজের ইচ্ছায় সরে এসেছি। আমার মনে হয় ঈশ্বর আমায় যা দিয়েছেন, তা আমার জন্য যথেষ্ট।”
পর্দা থেকে দূরে সরে গিয়ে এখন তিনি নিজের নিভৃত দুনিয়াতেই মগ্ন। সাহিত্যচর্চা ও বই লেখাই এখন তাঁর প্রধান সঙ্গী। ২০০১ সালে কলকাতা বইমেলায় তাঁর লেখা ছোটদের দুটি বই প্রকাশিত হয়েছিল, যা তৎকালীন সময়ে বিপুল প্রশংসা পায় এবং প্রায় ১২৭টি স্কুলে পাঠ্যপুস্তক ও সহায়িকা হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। গ্ল্যামারের আলো থেকে দূরে, নিজের আত্মমগ্ন জগতে বই ও লেখার মাঝেই এখন পরম শান্তিতে দিন কাটাচ্ছেন বাংলা বিনোদন জগতের চিরস্মরণীয় এই ‘পিসিমা’।