মধ্যপ্রাচ্যে নতুন সামরিক সমীকরণ! সৌদি আরবের সুরক্ষায় এবার দ্রুত সেনা পাঠাচ্ছে পাকিস্তান ও তুরস্ক

ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের ক্রমবর্ধমান হামলা শক্ত হাতে মোকাবিলা করতে বহুচর্চিত ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা’ চুক্তির বাস্তবায়ন শুরু করল মুসলিম বিশ্বের প্রভাবশালী দেশগুলি। চুক্তি অনুযায়ী, এবার সৌদি আরবে যৌথভাবে দ্রুত সেনা মোতায়েন করতে চলেছে পাকিস্তান, তুরস্ক ও সৌদি আরব নিজে। সম্প্রতি সৌদি রাজধানী রিয়াদের এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে তিন দেশের প্রতিরক্ষা ও বিদেশমন্ত্রীদের উপস্থিতিতে এই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। গত ৭ আগস্ট আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষরিত হয়েছিল এই বহুচর্চিত ‘মক্কা প্রতিরক্ষা জোট’ চুক্তি।

ন্যাটোর আদলে তৈরি হচ্ছে যৌথ প্রতিরক্ষা বলয়
চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, এই তিন দেশের মধ্যে যেকোনো একটি দেশের ওপর যদি কোনো শত্রু রাষ্ট্র বা গোষ্ঠী আক্রমণ চালায়, তবে তা এই জোটভুক্ত প্রতিটি দেশের ওপর হামলা হিসেবে গণ্য করা হবে। আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, উত্তর আটলান্টিক নিরাপত্তা জোট বা ন্যাটোর (NATO) প্রতিষ্ঠাকালীন সনদের মূলধারার সঙ্গে এই ‘মক্কা প্রতিরক্ষা জোট’-এর কাঠামোর হুবহু মিল রয়েছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে সৌদি আরবের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খালিদ বিন সালমান জানান, ইয়েমেনের ইরানপন্থী হুতিদের নগ্ন আগ্রাসন এবং এর নেপথ্যে থাকা শক্তিগুলোকে উপযুক্ত জবাব দিতে এই জোটের আওতায় ‘সম্মিলিত প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা’ সক্রিয় করার বিষয়ে সর্বসম্মতিক্রমে একমত হয়েছেন নেতারা। সৌদি আরব এবং পবিত্র স্থানগুলোর সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে এই তিন দেশের ঐক্য ও সংহতি আরও সুদৃঢ় হলো বলে জানান তিনি।

পাকিস্তানের সামরিক ভূমিকা ও সরকারি বিবৃতি
পাকিস্তানের বিদেশ মন্ত্রক থেকে প্রকাশিত একটি পৃথক বিবৃতিতে স্পষ্ট জানানো হয়েছে যে, চুক্তি অনুযায়ী এই তিন দেশ তাদের পূর্বনির্ধারিত সামরিক শক্তি ও সক্ষমতা অনুযায়ী দ্রুত সৈন্য ও অস্ত্রশস্ত্র সৌদি আরবে মোতায়েন করবে। প্রতিটি দেশের নিজস্ব আইন এবং অনুমোদিত চুক্তি মেনেই এই যৌথ সামরিক পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করা হবে।

এদিকে, হুতিদের গত মাসে দখল করা বেশ কিছু এলাকা পুনর্দখল করতে ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের অনুগত বাহিনী সম্প্রতি একটি বড় পাল্টা অভিযান শুরু করেছে। সৌদি সমর্থিত এই ইয়েমেনি বাহিনী দাবি করেছে যে, তারা লোহিত সাগরের কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী মোখা পুনর্দখল করেছে এবং বাব আল-মানদেব প্রণালির নিয়ন্ত্রণ এখন তাদের হাতে রয়েছে। ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীর এই অভিযানে পূর্ণ সমর্থন জানিয়ে সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোটের ১০০টি যুদ্ধবিমান আকাশপথে সহায়তা দিচ্ছে।

হুতিদের পাল্টা হামলা ও জোটের সামরিক শক্তি
অন্যদিকে, রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং উপকূলীয় শহর রাবিগের আরামকো তেল শোধনাগারে জোরালো ড্রোন বা মিসাইল হামলা চালানোর দাবি করেছে হুতি বিদ্রোহীরা। এছাড়া একটি বিমানবন্দর ও বিমানঘাঁটিতেও আঘাত হানার দাবি করেছে তারা, যদিও সৌদি প্রশাসনের পক্ষ থেকে এই দাবির সত্যতা নিয়ে এখনও কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করা হয়নি।

২০২৬ সালের গ্লোবাল ফায়ারপাওয়ার ইনডেক্স অনুযায়ী, পাকিস্তান, তুরস্ক ও সৌদি আরবের এই নতুন সামরিক জোটের সম্মিলিত সক্রিয় সেনা সদস্যের সংখ্যা প্রায় ১৪ লাখ। পাশাপাশি, এই তিন দেশের যৌথ শক্তিভাণ্ডারে রয়েছে প্রায় ৩ হাজার ৪০০টি শক্তিশালী সামরিক বিমান, ৬ হাজার যুদ্ধংসী ট্যাঙ্ক এবং ৩৪০টিরও বেশি আধুনিক নৌযুদ্ধের সরঞ্জাম। মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে এই শক্তিশালী ত্রিমুখী জোট বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে বলেই মনে করছে আন্তর্জাতিক মহল।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *