“খবর দেখেই সাসপেন্ড করা যায় না!” জ্ঞানেশ কুমারের পদ নিয়ে কড়া বার্তা দিল শীর্ষ আদালত

দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার (CEC) জ্ঞানেশ কুমারকে কি অবিলম্বে তাঁর পদ থেকে অপসারণ করা হবে? এই জল্পনার অবসান ঘটিয়ে সোমবার সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট জানিয়ে দিল যে, সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে বা প্রাথমিক অভিযোগের জেরে তাঁকে এখনই পদ থেকে সরানো বা সাসপেন্ড করার কোনো নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে না। তবে একই সঙ্গে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে নির্বাচন কমিশনের কাছে সমস্ত নথিপত্র ও সিদ্ধান্তের মূল রেকর্ড তলব করেছে শীর্ষ আদালত।

সুপ্রিম কোর্টের বেঞ্চ ও প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ

সোমবার প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত, বিচারপতি জয়মালা বাগচি এবং বিচারপতি ভি. মোহনার বিশেষ বেঞ্চ স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছে, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলি সবসময় আইন মেনে কাজ করবে বলেই আদালত আশা করে। মামলাকারীদের পক্ষে আইনজীবী বিকাশ সিং দাবি করেন যে, নির্বাচন কমিশনের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে আইন লঙ্ঘিত হয়েছে। তাই জ্ঞানেশ কুমারকে অবিলম্বে পদ থেকে সরিয়ে বাকি দুই নির্বাচন কমিশনারের মাধ্যমে কমিশন পরিচালনার নির্দেশ দেওয়া হোক।

তবে প্রধান বিচারপতি এই আর্জি খারিজ করে সাফ জানিয়ে দেন যে, আগে নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য শোনা এবং তাদের জবাব খতিয়ে দেখা অত্যন্ত জরুরি। আদালতের পর্যবেক্ষণ, যদি পরবর্তী সময়ে অভিযোগ প্রমাণিত হয় এবং আইন লঙ্ঘনের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ মেলে, তবে সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্তগুলি বাতিল করতে পারে আদালত। কিন্তু এই মুহূর্তে জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে কোনো অন্তর্বর্তী সাসপেনশন বা অপসারণের নির্দেশ দেওয়া সম্ভব নয়।

সিইসি-কে সরানোর সাংবিধানিক পদ্ধতি কী?

আইনি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সংবিধানে মুখ্য নির্বাচন কমিশনারকে অপসারণের প্রক্রিয়া অত্যন্ত কঠোর। সংবিধানের ৩২৪(৫) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, একজন সিইসি-কে সরাতে গেলে সুপ্রিম কোর্টের কোনো বিচারপতিকে অপসারণের সমতুল্য পদ্ধতি অনুসরণ করতে হয়।

সংবিধানের ১২৪(৪) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, প্রমাণিত অসদাচরণ বা অক্ষমতার ভিত্তিতে সংসদের উভয় কক্ষে (লোকসভা ও রাজ্যসভা) মোট সদস্যসংখ্যার সংখ্যাগরিষ্ঠতা এবং উপস্থিত ও ভোটদানকারী সদস্যদের অন্তত দুই-তৃতীয়াংশের সমর্থনে অপসারণের প্রস্তাব পাশ হতে হয়। এরপর রাষ্ট্রপতির চূড়ান্ত অনুমোদনের পরেই এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। অর্থাৎ, সুপ্রিম কোর্টের সাধারণ নির্দেশে বা শুধুমাত্র কোনো মামলার ভিত্তিতে সিইসি-কে রাতারাতি পদচ্যুত করা সম্ভব নয়।

ফর্ম-৬ ও এসআইআর (SIR) বিতর্ক এবং কমিশনের রেকর্ড তলব

মামলায় মূল অভিযোগ তোলা হয়েছে যে, এসআইআর (SIR) ও ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে ফর্ম-৬ এ কিছু অতিরিক্ত তথ্য ও ঘোষণা চাওয়া হয়েছে, যা অন্য নির্বাচন কমিশনারদের সর্বসম্মত অনুমোদন ছাড়াই করা হয়েছে। মামলাকারীদের দাবি, বর্তমান সিইসি একতরফাভাবে এই সমস্ত সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন।

এদিনের শুনানিতে সুপ্রিম কোর্ট পরিষ্কার করে দিয়েছে যে, অতীতে এসআইআর সংক্রান্ত কিছু বিষয়ে কমিশনকে ছাড় দেওয়া হলেও, ফর্ম-৬ এ আনা কোনো পরিবর্তিত রূপ আদালত স্বয়ংক্রিয়ভাবে অনুমোদন করেনি। কে বা কারা এই ফর্ম সংশোধন করেছেন এবং এই সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় যথাযথ প্রক্রিয়া বা সংখ্যাগরিষ্ঠতা মানা হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখতেই কমিশনকে সমস্ত দাপ্তরিক রেকর্ড জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের জবাব এবং রেকর্ড হাতে পাওয়ার পরেই এই মামলার পরবর্তী ও চূড়ান্ত পদক্ষেপ নির্ধারণ করবে শীর্ষ আদালত।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *