চাঁদের বুকে পারমাণবিক চুল্লি বসানোর মহাযুদ্ধ! আমেরিকা, চিন ও রাশিয়ার এই গোপন লড়াইয়ে কি বড় বিপদের মুখে পৃথিবী?

ভবিষ্যতের মহাকাশ অভিযানের প্রস্তুতি এবং চাঁদের বুকে স্থায়ী ঘাঁটি গড়ার লক্ষ্যে এবার এক অভিনব ও ঝুঁকিপূর্ণ প্রতিযোগিতায় নেমেছে মহাশূন্যের তিন পরাশক্তি—আমেরিকা, চিন ও রাশিয়া। দেশগুলোর বিশ্বাস, চাঁদে স্থায়ী বসতি স্থাপন, খনিজ সম্পদ অন্বেষণ এবং মহাকাশের আরও গভীরে সফল অভিযান পরিচালনার জন্য সৌরশক্তির পাশাপাশি পারমাণবিক শক্তিই একমাত্র ভরসা।
চাঁদে কেন প্রয়োজন পারমাণবিক চুল্লি?
দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, চাঁদে একটি স্থায়ী ঘাঁটি স্থাপনের জন্য নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের প্রয়োজন। যদিও সৌর প্যানেল দিনের বেলায় বিদ্যুৎ দিতে পারে, তবে পৃথিবীর ক্যালেন্ডার অনুযায়ী চাঁদের বুকে একটানা দু’সপ্তাহের বেশি সময় ধরে রাত থাকে। ফলে শুধুমাত্র সৌরশক্তির ওপর নির্ভর করে টিকে থাকা অসম্ভব। একমাত্র পারমাণবিক চুল্লিই সূর্যালোক ছাড়াই নিরবচ্ছিন্নভাবে দীর্ঘ সময় ধরে বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে সক্ষম।
নাসার পরিকল্পনা অনুযায়ী, তারা এমন একটি পারমাণবিক চুল্লি প্রস্তুত করতে চাইছে যা মহাকাশ যাত্রা সহ্য করতে পারবে এবং চাঁদের দক্ষিণ মেরুর কাছে কোনো রক্ষণাবেক্ষণ ছাড়াই কাজ করবে। নাসার লক্ষ্য, ২০৩০ সালের ডিসেম্বরের মধ্যেই এই চুল্লি উৎক্ষেপণের জন্য প্রস্তুত করা। অন্যদিকে, রাশিয়া ও চিন যৌথভাবে ২০৩৬ সালের মধ্যে ‘সেলিনা’ (Selina) নামের একটি চন্দ্র চুল্লি তৈরির গোপন পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে, যার মূল উদ্দেশ্য হলো চিনের নেতৃত্বাধীন স্টেশনগুলিতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ করা। নাসার প্রস্তাবিত ‘লুনার রিঅ্যাক্টর-১’ ২০ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে এবং পাঁচ বছর স্বয়ংক্রিয়ভাবে চলবে। অন্যদিকে রাশিয়ার সেলেনা চুল্লিটি ১০ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে এবং এক দশক ধরে চলার ক্ষমতা রাখবে।
পারমাণবিক চুল্লি বসানোর মারাত্মক ঝুঁকি
এই উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনার নেপথ্যে রয়েছে বিরাট বিপদ। বিজ্ঞানীরা ইতিমধ্যেই সতর্ক করেছেন যে, চাঁদে পারমাণবিক চুল্লি নির্মাণে তাড়াহুড়ো করলে ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। কখনও কোনো রকেট উৎক্ষেপণ ব্যর্থ হলে তেজস্ক্রিয় পদার্থ মহাকাশে বা চাঁদের বুকে ছড়িয়ে পড়ার মারাত্মক আশঙ্কা রয়েছে।
তাছাড়া, চাঁদের মতো প্রতিকূল পরিবেশে চুল্লি স্থাপন ও তা রক্ষণাবেক্ষণ করা অত্যন্ত দুরূহ কাজ। মহাকাশচারী ও মূল্যবান যন্ত্রপাতির ওপর তেজস্ক্রিয়তার ঝুঁকি কমাতে ওই চুল্লির আশপাশের এলাকায় যাতায়াতও কঠোরভাবে সীমিত করতে হবে। এই ঝুঁকি এড়াতে আমেরিকা ও রাশিয়া উভয় দেশই তাদের রিয়্যাক্টরগুলিকে নিষ্ক্রিয় অবস্থায় চাঁদে পাঠানোর পরিকল্পনা করেছে, যাতে পরিবহনের সময় দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমানো যায়।
ভূ-রাজনীতি ও মহাকাশ দখলের লড়াই
১৯৬৭ সালের আন্তর্জাতিক মহাকাশ চুক্তি অনুযায়ী, কোনো দেশই চাঁদ বা তার কোনো অংশকে নিজেদের ভূখণ্ড বলে দাবি করতে পারবে না। তা সত্ত্বেও, দেশগুলি তাদের ঘাঁটির আশেপাশের এলাকায় যাতায়াত সীমিত করতে পারবে কি না এবং চাঁদ থেকে আহরিত সম্পদের মালিকানা কার হাতে থাকবে, তা নিয়ে ইতিমধ্যেই আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। আমেরিকার মূল আশঙ্কা, চিন ও রাশিয়া মিলে চাঁদে পারমাণবিক চুল্লি ও ঘাঁটি তৈরি করে ফেললে চাঁদের একটা বড় অংশ তাদের নিয়ন্ত্রণে চলে যাবে এবং মার্কিন মহাকাশচারী ও রোভারগুলির অবাধ বিচরণভূমি সংকুচিত হয়ে পড়বে। যদিও এই দেশগুলি এখনও পরীক্ষামূলকভাবে প্রমাণ করতে পারেনি যে এই বিশাল পারমাণবিক চুল্লিগুলি চাঁদের মাটিতে বাস্তবে স্থাপন ও পরিচালনা করা সম্ভব কি না, তবুও মহাশূন্যের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে এই ঠান্ডা লড়াই ইতিমধ্যেই এক নতুন উত্তেজনার সৃষ্টি করেছে।