‘দুর্গা’ কি শুধুই নাম নাকি এক অলৌকিক সাউন্ড ফ্রিকোয়েন্সি? এই দুই অক্ষরের মধ্যেই লুকিয়ে আছে কোন বিরাট রহস্য?

সৃষ্টি তখন ক্রমশ তলিয়ে যাচ্ছে এক জমাট অন্ধকারের গভীরে। টানা একশো বছর পৃথিবীতে নেই এক ফোঁটা বৃষ্টি। নদী শুকিয়ে কাঠ, গাছপালা নিশ্চিহ্ন। চারদিকে শুধুই মৃত্যু আর হাহাকার। কারণ একটাই— চুরি গিয়েছে পবিত্র বেদ। আর সেই দুঃসাহসিক চুরির নেপথ্যে ছিল এক প্রবল পরাক্রমশালী অসুর, দুর্গমাসুর।
প্রসিদ্ধ ‘দেবী ভাগবত পুরাণ’-এর পাতা ওল্টালে ঠিক এই ভয়ংকর দৃশ্যেরই মুখোমুখি হতে হয়। দুর্গমাসুর ব্রহ্মার বর লাভ করে বেদ চুরি করে নেওয়ার ফলে ঋষিরা সমস্ত মন্ত্র ভুলে যান। যজ্ঞ বন্ধ হয়ে যায়, আর দেবতারাও হয়ে পড়েন শক্তিহীন। স্বর্গ, মর্ত্য ও পাতাল— তিন লোকেই নেমে আসে এক মহাজাগতিক সংকট। দেবতারা যখন মরিয়া হয়ে আদি পরাশক্তির আরাধনা শুরু করেন, তখন সেই ডাকে সাড়া দিয়ে আবির্ভূত হন দেবী। পুরাণে বলা হয়েছে, তিনি সেসময় নিজের শরীর থেকে শাকসবজি ও ফলমূল সৃষ্টি করে ক্ষুধার্ত প্রাণীদের প্রাণ বাঁচিয়েছিলেন। আর সেই কারণেই দেবী পরিচিত হন ‘শাকম্ভরী’ নামে। এরপরই শুরু হয় এক রক্তক্ষয়ী মহাযুদ্ধ।
যেভাবে এল ‘দুর্গা’ নাম
টানা কয়েক দিন ধরে চলা সেই ভয়াবহ যুদ্ধে দেবীর ত্রিশূল ফালাফালা করে দেয় দুর্গমাসুরের বুক। মহিষাসুর বধের অনেক আগেই, এই দুর্গমাসুরকে বিনাশ করে দেবী সমগ্র সৃষ্টিকে এক চরম দুর্গতির হাত থেকে রক্ষা করেছিলেন। আর ঠিক সেই দিনই, দুর্গমাসুরকে সম্পূর্ণ বিনাশ করার জন্য দেবতারা তাঁর নামকরণ করেছিলেন ‘দুর্গা’।
আধুনিক গবেষণা এবং প্রাচীন পুঁথি ঘাঁটলে দেখা যায়, এই নামের পরতে পরতে লুকিয়ে রয়েছে এক গভীর রহস্য। প্রাচীন সংস্কৃত অভিধান ‘শব্দকল্পদ্রুম’-এ স্পষ্ট বলা হয়েছে, ‘দুর্গা’ নিছক কোনো নাম নয়; এটি প্রাচীন ভারতের এক আদিম ‘সাউন্ড ফ্রিকোয়েন্সি’ বা শব্দ তরঙ্গ। নামটির প্রতিটি অক্ষর ভেঙে বিশ্লেষণ করলে দাঁড়ায়—
‘দ’ অক্ষরটি হলো দৈত্যনাশক।
‘উ’-কার জীবনের যাবতীয় বিঘ্ন বা বাধা নিমেষে মুছে ফেলে।
‘রেফ’ (র্) করে রোগনাশ।
‘গ’ মানে সমস্ত পাপের বিনাশ।
এবং শেষের ‘আ’-কার হলো ভয় ও শত্রুনাশক।
অর্থাৎ, যে প্রবল শক্তি পাপ, রোগ, শত্রু আর দুর্গতি থেকে পরম মমতায় বিশ্বকে আগলে রাখে, তিনিই হলেন দুর্গা।
আজকের জীবনে দুর্গার আসল অর্থ
যুগ বদলেছে ঠিকই, কিন্তু অসুরদের রূপ বদলে আজ তা আমাদের চারপাশে রয়ে গিয়েছে। আজ হয়তো সেই পৌরাণিক দুর্গমাসুর নেই, কিন্তু রোজকার জীবনে অবসাদ, উদ্বেগ আর হেরে যাওয়ার ভয়ের মতো অদৃশ্য অসুরদের সঙ্গে লড়াই চালিয়ে যেতে হয় প্রত্যেককে। কখনও কর্মক্ষেত্রের প্রবল প্রতিযোগিতা, কখনও সম্পর্কের টানাপোড়েন, আবার কখনও নিছকই একাকীত্ব মানুষকে গ্রাস করে।
প্রতিদিনের এই জটিল চক্রব্যূহে মানুষ যখন দিশেহারা হয়ে পড়ে, তখন এই ছোট্ট দু’অক্ষরের নামটি যেন এক অদৃশ্য বর্ম হয়ে সামনে এসে দাঁড়ায়। যুগ যুগ ধরে মুনি-ঋষিরা এই নামকে শ্রেষ্ঠ রক্ষাকবচ হিসেবে মেনে এসেছেন। কারণ, এই নাম জপ করার সঙ্গে সঙ্গে মনের ভেতরের সব নেতিবাচক চিন্তা দূরে সরে যায় এবং মনে এক অদ্ভুত স্থিরতা আসে। বিপদে পড়লে, ভয় পেলে বা অন্ধকার রাস্তায় একা হাঁটতে গেলে সবার আগে মানুষের মুখে যে নামটা আসে, তা হলো ‘দুর্গা’। শত কষ্টের মাঝেও এই নাম মনে করিয়ে দেয় যে, অন্ধকারের পরেই আলোর নতুন ভোর রয়েছে। দুর্গা তাই শুধুই মণ্ডপের মৃন্ময়ী মূর্তি নন, তিনি হলেন চরম বিপদের দিনে মানুষের মনের ভেতরের সেই অনন্ত শক্তি, যা কানে কানে বলে— “ভয় নেই, আমি আছি।”