যিনি গণেশের স্ত্রী নন! জানেন কি মহা সপ্তমীর সকালে মণ্ডপে পুজো হওয়া ‘কলাবৌ’ আসলে কে?

মহাসপ্তমীর সকালে দুর্গাপুজোর মণ্ডপে মণ্ডপে অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে আয়োজন করা হয় ঐতিহ্যবাহী ‘নবপত্রিকা’ স্নানের। সাধারণ মানুষের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত একটি ভুল ধারণার বশে অনেকেই একে ‘কলাবৌ’ এবং সিদ্ধিদাতা গণেশের স্ত্রী হিসেবে গণ্য করে থাকেন। কিন্তু পৌরাণিক ও শাস্ত্রীয় মতে এই ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। নবপত্রিকা কোনো পৃথক দেবী বা গণেশের বধূ নন; এটি মূলত দেবী দুর্গারই নয়টি ভিন্ন উদ্ভিজ্জ রূপের এক একত্রিত ও পবিত্র প্রকাশ।
নবপত্রিকার আক্ষরিক অর্থ ও কোন গাছে দেবীর কোন রূপ?
‘নবপত্রিকা’ শব্দের আক্ষরিক অর্থ হলো নয়টি পাতা বা উদ্ভিদ। নয়টি আলাদা আলাদা বৃক্ষ ও উদ্ভিদের সমন্বয়ে এই বিশেষ প্রতীক তৈরি করা হয়, যা মূলত বঙ্গজীবনের প্রাচীন কৃষিসংযোগ ও প্রকৃতি উপাসনার এক অনন্য নিদর্শন। শাস্ত্র অনুসারে, নবপত্রিকার এই নয়টি উদ্ভিদে দেবী দুর্গার নয়টি বিশেষ শক্তি বাস করে:
রম্ভা (কলাগাছ): এতে অবস্থান করেন দেবী ব্রহ্মাণী।
কচ্ছ্বী (কচু গাছ): কেন না এতে বাস করেন দেবী কালিকা।
হরিদ্রা (হলুদ গাছ): এতে অধিষ্ঠান করেন দেবী উমার।
জয়ন্তী (জয়ন্তী গাছ): এই উদ্ভিদে অবস্থান করেন দেবী কার্তিকী।
বিল্ব (বেল গাছ): এতে বাস করেন ভগবান শিবের প্রিয়া দেবী শিবা।
দাড়িম্ব (ডালিম গাছ): এতে দেবী রক্তদন্তিকা বিরাজ করেন।
অশোক (অশোক গাছ): এতে অধিষ্ঠিত দেবী শোকরহিতা।
মানক (মানকচু গাছ): এতে থাকেন দেবী চামুণ্ডা।
ধান (ধান গাছ): ধান গাছে বাস করেন ধনদেবী লক্ষ্মী।
কেন তাঁকে ‘কলাবৌ’ বলা হয়?
এই নয়টি উদ্ভিদকে একত্রিত করে শ্বেতসর্ষে এবং হলুদ সুতো দিয়ে বাঁধা হয়। তারপর তাঁকে লালপাড় সাদা শাড়িতে আবৃত করে ঘোমটা দেওয়া এক নববধূর রূপ দেওয়া হয়। ঠিক এই কারণেই লোকমুখে তিনি ‘কলাবৌ’ নামে পরিচিতি লাভ করেছেন। যেহেতু গণেশের ডান পাশে তাঁকে স্থাপন করা হয়, তাই সাধারণ মানুষ ভ্রান্তিবশত তাঁকে গণেশের স্ত্রী মনে করেন।
আসলে শারদোৎসব হলো হেমন্তের শুরুতে শস্যশ্যামলা বসুন্ধরাকে ধন্যবাদ জানানোর এক শুভ মুহূর্ত। প্রাচীন ভারতে যখন প্রাতিষ্ঠানিক মূর্তিপূজার প্রচলন হয়নি, তখন মানুষ প্রকৃতির দান—গাছপালা এবং নতুন ফসলকেই ঈশ্বর হিসেবে আরাধনা করত। নবপত্রিকার প্রতিটি উপাদান দৈনন্দিন জীবনে ঔষধি গুণসম্পন্ন এবং কৃষিপ্রধান বাংলার অত্যন্ত প্রয়োজনীয় শস্য। দুর্গোৎসবে নবপত্রিকার পুজো আমাদের বারবার মনে করিয়ে দেয় যে, আদিশক্তি দেবী দুর্গা কেবল মৃন্ময়ী প্রতিমাতেই সীমাবদ্ধ নন; তিনি প্রকৃতির প্রতিটি সবুজ পাতায় এবং উদ্ভিদে জীবন্ত রূপে বিরাজমান।