দাম্পত্য বিবাদে পকসো আইনের যথেচ্ছ ব্যবহার! কলকাতা হাই কোর্টের এই কড়া রায়ে ঘুম উড়েছে অনেকের

পকসো (POCSO) আইনের মতো অত্যন্ত গুরুতর ফৌজদারি ধারা গঠনের ক্ষেত্রে বিচার প্রক্রিয়া ও আদালতের ভূমিকা নিয়ে এবার অত্যন্ত কড়া বার্তা দিল কলকাতা হাই কোর্ট (Calcutta High Court)। আদালতের স্পষ্ট অভিমত, কোনো মামলায় হঠাৎ করে নতুন করে গুরুতর কোনো ফৌজদারি ধারা যুক্ত করার আগে তার নেপথ্যের অভিযোগের ভিত্তি, কেস ডায়েরির নথি এবং প্রাথমিক উপাদানগুলি অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে খতিয়ে দেখা জরুরি। শুধুমাত্র তদন্তকারী সংস্থার অন্ধ আবেদনের ভিত্তিতে বা জবানবন্দি রেকর্ড হলেই সেই বয়ানের ওপর নির্ভর করে রাতারাতি পকসো আইন প্রয়োগ করা যায় না।

ঠিক কী হয়েছিল এই মামলায়?
আইনি সূত্রে জানা গিয়েছে, এই মামলার সূত্রপাত হয়েছিল মূলত এক দম্পতির দীর্ঘদিনের পারিবারিক ও দাম্পত্য অশান্তিকে কেন্দ্র করে। প্রথমে সিউড়ি থানার পুলিশ নির্দিষ্ট কয়েকটি ধারায় তদন্ত শেষ করে চার্জশিট জমা দেয় এবং বীরভূমের বিশেষ আদালত সেই চার্জশিট গ্রহণও করেছিল। কিন্তু এরপরই মামলার মোড় সম্পূর্ণ ঘুরে যায়।

দম্পতির মেয়ের নাবালিকা থাকাকালীন সময়ের একটি ঘটনার অভিযোগ তুলে নতুন করে তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়। ম্যাজিস্ট্রেটের সেই নির্দেশমতোই মেয়েটির গোপন জবানবন্দি রেকর্ড করা হয় এবং তার ভিত্তিতেই মামলাটিতে পকসো আইনের ৮, ১০ এবং ১২ নম্বর ধারা যুক্ত করা হয়। পরবর্তীতে বিশেষ আদালত সেই ধারাগুলির ভিত্তিতেই অভিযুক্তের বিরুদ্ধে চার্জ গঠন করে। এই নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েই শেষ পর্যন্ত হাইকোর্টের দ্বারস্থ হন অভিযুক্ত ব্যক্তি।

হাই কোর্টের চাঞ্চল্যকর পর্যবেক্ষণ ও নির্দেশ
মামলার সমস্ত নথি ও তথ্যপ্রমাণ খতিয়ে দেখতে গিয়ে বিচারপতি অজয় কুমার মুখোপাধ্যায়ের বেঞ্চের নজরে আসে অভিযোগের সময়কাল এবং বিভিন্ন স্তরের বয়ানের মধ্যে থাকা স্পষ্ট অসঙ্গতি। আদালতের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ম্যাজিস্ট্রেট পুনরায় তদন্তের নির্দেশ দেওয়ার আগে পুলিশের কাছে দেওয়া প্রাথমিক বয়ানে মেয়েটির মুখে এমন কোনো গুরুতর অভিযোগের লেশমাত্র ছিল না। পরবর্তীতে সিআরপিসির ১৬১ ও ১৬৪ ধারায় যে নতুন বয়ান রেকর্ড করা হয়, তা মূলত শিখিয়ে-পড়িয়ে বা প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার উদ্দেশ্যেই করানো হয়েছিল বলে সন্দেহ প্রকাশ করেছে আদালত।

বিচারপতির মতে, নথিপত্রের সামগ্রিক পর্যালোচনায় স্পষ্ট যে এই অভিযোগের পেছনে স্পষ্ট অসৎ উদ্দেশ্য ও প্রতিহিংসা কাজ করেছে। ফলে কেবল পরবর্তী জবানবন্দির ভিত্তিতে সরাসরি পকসোর মতো অত্যন্ত কঠোর আইন প্রয়োগ করার যৌক্তিকতা নিয়ে বড় প্রশ্নচিহ্ন তুলেছে আদালত।

চার্জ গঠনের সময় নিম্ন আদালতের মূল দায়িত্ব কী, তা স্পষ্ট করে ডিভোর্স সংক্রান্ত এই মামলায় পকসো আইনে গঠিত সমস্ত চার্জ ও পরবর্তী নির্দেশিকাগুলি সম্পূর্ণ বাতিল করে দিয়েছে হাই কোর্ট। একইসঙ্গে মামলাটি পুনরায় বীরভূমের নিম্ন আদালতে ফেরত পাঠানো হয়েছে, যেখানে আগের সাধারণ ভারতীয় দণ্ডবিধির ধারাগুলির ভিত্তিতেই বিচারপ্রক্রিয়া পরিচালিত হবে। গার্হস্থ্য হিংসার ক্ষেত্রে ৪৯৮-এ ধারার অপব্যবহার নিয়ে অতীতে একাধিকবার প্রশ্ন ওঠার পর, দাম্পত্য বিবাদে পকসো আইনের এই অপব্যবহার নিয়ে হাই কোর্টের সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণ রাজ্য জুড়ে এক নতুন আইনি বিতর্ক উসকে দিল।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *