পেটের ভেতর শিশুর ধুকপুক আওয়াজ শুনলেই কি সব ঠিক? বিশ্ব হার্ট দিবসে চিকিৎসকদের বিস্ফোরক সতর্কবার্তা!

গর্ভাবস্থায় (Pregnancy) প্রথমবার আল্ট্রাসাউন্ড মেশিনে যখন সন্তানের হৃদস্পন্দনের ধুকপুক শব্দটা শোনা যায়, সেই মুহূর্তটি বাবা-মায়ের কাছে ঠিক কতটা আবেগঘন ও বিশেষ, তা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। মায়ের গর্ভের ওই ছোট্ট প্রাণের অস্তিত্বটুকু জানান দেয় ওই হার্টবিট। কিন্তু গর্ভস্থ শিশুর হৃৎপিণ্ড বা হার্ট পুরোপুরি সুস্থ ও ঠিকমতো তৈরি হচ্ছে কি না, তা বোঝার জন্য কেবল ওই হার্টবিট শুনলেই কি সবটা পরিষ্কার হয়ে যায়? ‘ওয়ার্ল্ড হার্ট ডে’ (World Heart Day)-র বিশেষ দিনে চিকিৎসকরা এক চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এনে জানাচ্ছেন—বিষয়টি আপাত যতটা সহজ মনে হয়, আদতে তা নয়। এর নেপথ্যে লুকিয়ে রয়েছে আরও বেশ কিছু জটিল ও গুরুত্বপূর্ণ দিক।
হার্টবিট শোনা মানেই কি সব ঠিক আছে?
মায়ের গর্ভে থাকতেই ধীরে ধীরে শিশুর হৃদপিণ্ড তৈরি হতে শুরু করে। সাধারণত রুটিন চেকআপের সময় চিকিৎসকরা স্টেথোস্কোপ বা আল্ট্রাসাউন্ডের মাধ্যমে শিশুর হার্টবিট শুনে থাকেন। চিকিৎসা বিজ্ঞান অনুযায়ী, একটি সম্পূর্ণ সুস্থ গর্ভস্থ শিশুর হার্ট রেট প্রতি মিনিটে ১১০ থেকে ১৬০-এর মধ্যে থাকে। তবে গর্ভে শিশুর পজিশন বা নড়াচড়ার ওপর ভিত্তি করে এই রেট সময়ে সময়ে কিছুটা বদলাতেও পারে।
জয়পুরের একটি নামী বেসরকারি হাসপাতালের রেডিওলজি এবং ফিটাল মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. অর্পিতা কউল জানাচ্ছেন, গর্ভাবস্থায় শিশুর হার্ট রেট ওঠানামা করা অত্যন্ত স্বাভাবিক একটি ঘটনা। তাই কোনো একদিনের স্ক্যান রিপোর্ট দেখে অতিরিক্ত ভয় পাওয়ার বা আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। চিকিৎসকরা সবসময় আগের রিপোর্ট এবং মায়ের সামগ্রিক স্বাস্থ্য মিলিয়ে তবেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছান।
ঠিক কখন চিকিৎসকদের সতর্ক হওয়া জরুরি?
মাঝে মাঝে দেখা যায়, গর্ভস্থ শিশুর হার্টবিট স্বাভাবিকের তুলনায় অস্বাভাবিক দ্রুত কিংবা খুব ধীরে চলছে। আবার কখনো কখনো হৃদস্পন্দনের ছন্দপতনও লক্ষ্য করা যায়। এর অর্থই যে শিশুর বড় কোনো জন্মগত হার্টের অসুখ রয়েছে, এমনটা ভেবে নেওয়ার কোনো কারণ নেই। বহু ক্ষেত্রেই এই ধরনের পরিবর্তন সম্পূর্ণ সাময়িক হয়। তবে আল্ট্রাসাউন্ডে যদি কোনো অস্বাভাবিক কিছু ধরা পড়ে, তবে চিকিৎসকরা সঙ্গে সঙ্গে ‘ফিটাল ইকোকার্ডিওগ্রাম’ (Fetal Echocardiogram) করার পরামর্শ দিয়ে থাকেন।
চণ্ডীগড়ের এক হাসপাতালের বিশিষ্ট বিশেষজ্ঞ ডা. ভবনীতৌর কৌর জানাচ্ছেন, সাধারণ রুটিন স্ক্যানের তুলনায় ফিটাল ইকোকার্ডিওগ্রাম অনেক বেশি নিখুঁত ও পরিষ্কার ধারণা দেয়। এর মাধ্যমে শিশুর হার্টের চেম্বার, ভালভ কিংবা রক্ত চলাচলের প্রধান পথগুলিতে কোনো ত্রুটি বা সমস্যা আছে কি না, তা অত্যন্ত স্পষ্ট ধরা পড়ে। সবচেয়ে বড় কথা, গর্ভাবস্থাতেই যদি আগে থেকে সমস্যা চিহ্নিত করা যায়, তবে জন্মের পর দ্রুত চিকিৎসার জন্য পর্যাপ্ত সময় হাতে পাওয়া যায়।
পরিসংখ্যান কী বলছে? গবেষণা বলছে বড় বিপদের কথা
চিকিৎসা বিজ্ঞান ও গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, শিশুদের জন্মগত হার্টের সমস্যা বর্তমানে অত্যন্ত উদ্বেগের একটি বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমেরিকার ‘সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন’ (CDC)-এর একটি সাম্প্রতিক গবেষণায় উঠে এসেছে এক ভয়ঙ্কর তথ্য—প্রতি ১০০ জন শিশুর মধ্যে অন্তত ১ জন কোনো না কোনো জন্মগত হার্টের সমস্যা নিয়ে জন্মায়। আর এদের মধ্যে প্রতি চার জনের মধ্যে একজনের শারীরিক অবস্থা এতটাই জটিল থাকে যে, জন্মের প্রথম বছরই তাঁদের বড় রকমের চিকিৎসার প্রয়োজন হয়।
হবু মায়েদের জন্য জরুরি পরামর্শ
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, গর্ভাবস্থার শেষ পর্যায়ে যদি হঠাৎ করে শিশুর নড়াচড়া কমে যায় কিংবা হার্টবিটে খুব বেশি অস্বাভাবিকতা লক্ষ্য করা যায়, তবে এক মুহূর্তও দেরি না করে অবিলম্বে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া উচিত। তবে অযথা আতঙ্কিত বা প্যানিক না করে নিয়মিত চেকআপ এবং সঠিক সময়ে চিকিৎসকের নির্দেশমতো আল্ট্রাসাউন্ড করালেই অনাগত সন্তানকে সুরক্ষিত রাখা সম্ভব।