ক্যাম্পাসে ঘুরে বেড়াচ্ছে মৃত ছাত্রীর ভূত! গুজবের জেরে রণক্ষেত্র দুই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, পুলিশের ওপর চড়াও ছাত্ররা

গত কয়েকদিন ধরে চরম উত্তেজনায় ফুটছে পঞ্জাবের দুটি নামী বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান—চিতকারা বিশ্ববিদ্যালয় এবং লাভলি প্রফেশনাল ইউনিভার্সিটি (এলপিইউ)। মাত্র ১৪০ কিলোমিটার দূরত্বের ব্যবধানে অবস্থিত এই দুই ক্যাম্পাসে ছাত্রীনিবাসের নিরাপত্তা ও নানা অবাস্তব গুজবকে কেন্দ্র করে যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছিল, তা শেষ পর্যন্ত ব্যাপক সংঘর্ষ ও হিংসাত্মক রূপ নেয়। সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া ভুয়া খবর এবং ছাত্রছাত্রীদের গভীর নিরাপত্তাহীনতার জেরে বর্তমানে উভয় ক্যাম্পাসেই পুরোপুরি অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে।
চিতকারা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভূতের গুজব ও তাণ্ডব
এই অশান্তির সূত্রপাত ঘটেছিল রাজপুরার কাছে অবস্থিত চিতকারা বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখানে হস্টেলের স্পিকারে অদ্ভুত শব্দ বাজিয়ে ভয় দেখানো এবং অতীতে আত্মহত্যা করা এক ছাত্রীর ‘ভূত’ ঘুরে বেড়ানোর ভিত্তিহীন ও অবাস্তব গল্প মুহূর্তের মধ্যে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে। এর মধ্যেই ক্যাম্পাসে একটি অ্যাম্বুল্যান্স এবং এক পুরোহিতের আগমন ঘটনাটিকে আরও রহস্যময় করে তোলে। যদিও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ স্পষ্ট জানিয়েছিল যে, এক অসুস্থ ছাত্রীকে হাসপাতাল থেকে ফিরিয়ে আনা হয়েছিল এবং ওই পুরোহিত এসেছিলেন নিজের মেয়ের সঙ্গে দেখা করতে।
কিন্তু ততক্ষণে সোশ্যাল মিডিয়ায় একাধিক ছাত্রী নিখোঁজ ও মৃত্যুর বানোয়াট গুজব ছড়িয়ে পড়েছিল। এই খবরের জেরে ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসে নেমে তীব্র বিক্ষোভ শুরু করেন। পরিস্থিতি এতটাই হাতের বাইরে চলে যায় যে পুলিশের গাড়ি ভাঙচুর করা হয় এবং ক্যাম্পাসের সম্পত্তির ব্যাপক ক্ষতি হয়। তবে পুলিশি তদন্তে স্পষ্ট জানানো হয়েছে যে, নিখোঁজ হওয়া ছাত্রীদের নাম বা পরিচয়ের সপক্ষে কোনো প্রমাণ মেলেনি এবং বাস্তবে এমন কোনো ঘটনার সত্যতাও পাওয়া যায়নি।
এলপিইউ ক্যাম্পাসে যৌন হেনস্থা ও আত্মহত্যার ভুয়া দাবি
চিতকারার রেশ কাটতে না কাটতেই প্রায় একই রকম উত্তেজনায় জ্বলে ওঠে ফাগওয়াড়ার এলপিইউ (LPU) ক্যাম্পাস। সেখানে গুজব রটে যায় যে, ছাত্রীনিবাসে ঢুকে এক বহিরাগত কর্মী এক ছাত্রীকে যৌন হেনস্থা করেছেন এবং অপমানের জেরে সেই ছাত্রী আত্মহত্যা করেছেন। এই বিস্ফোরক দাবি ছড়াতেই হাজার হাজার শিক্ষার্থী রাস্তায় নেমে আসেন। বিক্ষোভ দ্রুত হিংসাত্মক রূপ নিয়ে জলন্ধর-ফাগওয়াড়া জাতীয় সড়কে ছড়িয়ে পড়ে, যার জেরে সম্পূর্ণ স্তব্ধ হয়ে যায় যান চলাচল।
ক্যাম্পাসের মধ্যে শোভা পাওয়া যুদ্ধবিমান ও সামরিক ট্যাঙ্কের ওপর চড়ে ছাত্ররা তীব্র ক্ষোভ উগরে দেন। একাধিক গাড়ি ও আসবাবপত্রে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয় এবং পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে বেশ কয়েকজন পুলিশকর্মী আহত হন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশকে বাধ্য হয়ে লাঠিচার্জ করতে হয় বলে অভিযোগ তোলেন আন্দোলনরত পড়ুয়ারা।
ভিডিও বিতর্ক ও পুলিশের কড়া পদক্ষেপ
পরিস্থিতি শান্ত করতে এলপিইউ কর্তৃপক্ষ দ্রুত একটি ভিডিও প্রকাশ করে। সেখানে অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা ঘরের তিন ছাত্রীকে বলতে শোনা যায় যে, এমন কোনো ঘটনাই আদতে ঘটেনি। কিন্তু এই পদক্ষেপ উল্টো হিতের বিপরীত ফল দেয়। ওই ছাত্রীরা পরবর্তীতে অভিযোগ করেন যে, তাঁদের দিয়ে জোর করে ও শিখিয়ে কথা বলানো হয়েছিল এবং অনুমতি ছাড়াই সেই ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে দেওয়া হয়।
এই ঘটনার পর কপূরথলা পুলিশ অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে এফআইআর দায়ের করে একটি বিশেষ তদন্তকারী দল (SIT) গঠন করেছে। তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, ফরেনসিক ও সিসিটিভি ফুটেজ খুঁটিয়ে খতিয়ে দেখা হচ্ছে, তবে প্রাথমিক তদন্তে এখনও পর্যন্ত কোনো অভিযোগের সত্যতা মেলেনি।
বর্তমান পরিস্থিতি ও প্রশাসনের উদ্বেগ
পরিস্থিতি সম্পূর্ণরূপে নিয়ন্ত্রণে আনতে এলপিইউ ক্যাম্পাসে দুই হাজারেরও বেশি পুলিশ কর্মী মোতায়েন করা হয়েছে। আগামী দশ দিনের জন্য সমস্ত ক্লাস স্থগিত রাখার পাশাপাশি পরীক্ষাও পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, চিতকারা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষও সাময়িকভাবে পঠনপাঠন বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। পঞ্জাব পুলিশের শীর্ষ কর্তারা জানিয়েছেন, দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনার মধ্যে সরাসরি কোনো যোগসূত্র নেই। তবে সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া অনির্ভরযোগ্য ও ভুয়া তথ্য কীভাবে হাজার হাজার তরুণ শিক্ষার্থীর মনে আতঙ্ক তৈরি করে এত বড় বিস্ফোরণ ঘটাতে পারে, সেটাই এখন প্রশাসনের কাছে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।