“উলের কাঁটায় ভাগ্য বদল!” ঘরোয়া শিল্পে আধুনিকতার ছোঁয়া লাগিয়ে তাক লাগালেন মেদিনীপুরের তরুণী, আয় জানলে চমকে যাবেন

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের রুচি বদলায়, বদলে যায় জীবনযাত্রার ধারাও। একসময় গ্রামবাংলার প্রায় প্রতিটি ঘরেই মা-ঠাকুমারা অবসর পেলেই উলের কাঁটা হাতে তুলে নিতেন। নিপুণ আঙুলের জাদুতে তৈরি হতো শীতের নরম সোয়েটার কিংবা ডাইনিং টেবিলের ফল ঢাকার নকশাদার সুদৃশ্য চাদর। কিন্তু আধুনিকতার চকচকে দুনিয়ায় হাতে বোনা সেই সব ঐতিহ্যবাহী সামগ্রী ক্রমশ হারিয়ে যেতে বসেছিল। তবে ঐতিহ্যের সেই চেনা কারুকাজেই হালফিলের আধুনিকতার ছোঁয়া লাগিয়ে স্বনির্ভরতার এক নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছেন পশ্চিম মেদিনীপুরের এক প্রত্যন্ত গ্রামের কলেজপড়ুয়া তরুণী। পুরনো হস্তশিল্পকে ‘কাস্টমাইজ’ করে তিনি প্রমাণ করে দিয়েছেন যে, মনের জোর আর ধৈর্য থাকলে ঘরে বসেই রোজগারের পথ প্রশস্ত করা যায়।
পশ্চিম মেদিনীপুরের কেশিয়াড়ি ব্লকের কলাবনি গ্রামের বাসিন্দা নন্দিতা দাস। সাধারণ এক পরিবারের এই তরুণী নিজের পড়াশোনার খরচ চালাতে বাড়িতে ছোটোদের টিউশন পড়ান। তবে পড়াশোনা এবং গৃহশিক্ষকতার ফাঁকে যেটুকু অবসর সময় বেঁচে থাকে, তা নষ্ট না করে তিনি কাজে লাগান উলের নান্দনিক কারুকাজে। সাধারণ উলের বল আর কাঁটার সাহায্যে তিনি তৈরি করে চলেছেন সময়ের চাহিদামতো নানা আকর্ষণীয় ও নজরকাড়া জিনিস। ফল ঢাকার সুদৃশ্য চাদর থেকে শুরু করে আধুনিক ডিজাইনের ট্রেন্ডি ব্যাগ, চাবির রিং, মাথার ক্লিপ ও হেয়ারব্যান্ড— সবই নিখুঁত হাতে ফুটিয়ে তুলছেন তিনি। শুধু তাই নয়, গ্রাহকের পছন্দ ও সুনির্দিষ্ট মাপ অনুযায়ী বানিয়ে দিচ্ছেন শীতের নানা ফ্যাশনেবল সোয়েটার ও মাফলারও।
বর্তমানে নন্দিতার এই উদ্যোগ আর কেবল শখের বৃত্তে আটকে নেই, বরং তা পুরোদস্তুর লাভজনক ব্যবসার রূপ নিয়েছে। তাঁর তৈরি নান্দনিক সামগ্রীগুলি এখন স্থানীয় বাজারের পাশাপাশি বিভিন্ন অনলাইন মাধ্যমের দৌলতে দূর-দূরান্তে ছড়িয়ে পড়েছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় পণ্যের ছবি দেখে অর্ডার দিচ্ছেন বহু ক্রেতা। নন্দিতার কথায়, এই ব্যবসা শুরু করার জন্য খুব বেশি পুঁজির প্রয়োজন হয় না; এর জন্য মূল পাথেয় হলো সামান্য কিছু উল, কাঁটা আর একবুক ধৈর্য। তাঁর মতে, রাজ্যের কোনো তরুণ-তরুণী যদি একে পেশা হিসেবে বেছে নেন, তবে ঘরে বসেই মাসে অন্তত ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা অনায়াসে উপার্জন করা সম্ভব।
পড়াশোনার পাশাপাশি নন্দিতার এই স্বনির্ভর হওয়ার উদ্যোগ ও অভিনব চিন্তাভাবনাকে কুর্নিশ জানিয়েছেন পরিবার, প্রতিবেশী থেকে শুরু করে এলাকার শিক্ষক ও প্রবীণ ব্যক্তিরাও। প্রত্যন্ত গ্রামীণ এলাকায় সুযোগের ঘাটতি থাকলেও, নিজের ইচ্ছাশক্তিতে ভর করে তিনি যেভাবে অন্য পড়ুয়া ও এলাকার মহিলাদের আত্মনির্ভর হওয়ার স্বপ্ন দেখাচ্ছেন, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। হারিয়ে যেতে বসা ঐতিহ্যবাহী ঘরোয়া শিল্পকে আধুনিক বাণিজ্যিক দিশা দিয়ে নন্দিতা দাস এখন গোটা অঞ্চলের বহু মানুষের কাছে এক উজ্জ্বল অনুপ্রেরণা।