“মায়ার খাসতালুকে মহাপ্রলয়!” উত্তরপ্রদেশের ২১ শতাংশ দলিত ভোট কি তবে এবার হাতছাড়া হতে চলেছে বসপার?

উত্তরপ্রদেশের রাজনৈতিক ময়দানে এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে বহুজন সমাজ পার্টি বা বসপার বর্তমান পরিস্থিতি। মায়াবতী এবং আকাশ আনন্দের মধ্যকার দূরত্ব, দলের অন্দরে সাংগঠনিক রদবদল এবং উত্তরাধিকার নিয়ে লাগাতার পরিবর্তনশীল ঘটনাপ্রবাহের জেরে এক অভূতপূর্ব রাজনৈতিক সংকটের মুখে দাঁড়িয়েছে দল। রাজনৈতিক মহলের মতে, এর সরাসরি ও সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়তে চলেছে উত্তরপ্রদেশের প্রায় ২১ শতাংশ দলিত ভোটের ওপরে, যা কি না আগামী ২০27 সালের বিধানসভা নির্বাচনের ক্ষমতার সমীকরণ পুরোপুরি বদলে দিতে পারে।

বসপার ভাঙন ও ভোট শেয়ারের রেকর্ড পতন:
ঐতিহাসিকভাবে দেখতে গেলে, উত্তরপ্রদেশের দলিত ভোটই ছিল বসপার সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক চালিকাশক্তি ও মূল শক্তি। কিন্তু বিগত কয়েকটি নির্বাচনে সেই দুর্গে ভাঙন ধরেছে। পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৭ সালের বিধানসভা নির্বাচনে যে দলটির ভোট শেয়ার ছিল ২২.২ শতাংশ, ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে তা ধস নেমে মাত্র ৯.৩৯ শতাংশে এসে ঠেকেছে। অর্থাৎ, মাত্র সাত বছরের ব্যবধানে বসপার ভোট ব্যাংক থেকে প্রায় ১৩ শতাংশেরও বেশি ভোট হারিয়ে গেছে। এমনকি ২০২৪ সালে একটিও লোকসভা আসন জিততে পারেনি দলটি, যা ২০২২ সালের বিধানসভাতেও মাত্র একটিতে সীমাবদ্ধ ছিল। প্রশ্ন উঠছে, তবে কি এবার চিরতরে হাতছাড়া হতে চলেছে বসপার এই ঐতিহ্যবাহী ভোট ব্যাংক?

বিরোধী শিবিরগুলির নজরে দলিত ভোট:
বসপার এই চরম দুর্বলতার সুযোগ নিতে আসরে নেমে পড়েছে বিরোধীরা। সমাজবাদী পার্টি (সপা) তাদের সুপরিচিত ‘পিডিপি’ (PDA—পশ্চিমাঞ্চল, দলিত ও সংখ্যালঘু) সমীকরণের মাধ্যমে দলিতদের নিজেদের দিকে টানতে দীর্ঘদিন ধরেই সক্রিয়। অন্যদিকে, তরুণ নেতা চন্দ্রশেখর আজাদের ‘আজাদ সমাজ পার্টি’ও দলিত যুবকদের মধ্যে নিজেদের প্রভাব বিস্তারে জোর কদম চালাচ্ছে। তবে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, কংগ্রেসের জন্য এই লড়াই কেন এতখানি তাৎপর্যপূর্ণ?

২০১৯ এবং ২০২৪ সালের ভোটের ফলাফল বিশ্লেষণ করলে এই সমীকরণ স্পষ্ট হয়ে যায়। ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে সমাজবাদী পার্টি ও বসপা ঐতিহাসিক জোট গড়ে লড়েছিল। সেবার প্রায় ৭৪ শতাংশ জাটভ ভোট জোটে গেলেও, তা সব সময় সপা প্রার্থীর বাক্সে পড়েনি। অন্যদিকে, ৬০ শতাংশ অ-জাটভ দলিত ভোট চলে গিয়েছিল বিজেপির ঝুলিতে। কিন্তু ছবিটা সম্পূর্ণ বদলে যায় ২০২৪ সালে। সেবার কংগ্রেস ও সমাজবাদী পার্টির হাত ধরার ফলে অ-জাটভ দলিত ভোটের প্রায় ৫৬ শতাংশই চলে যায় এই ইন্ডিয়া জোটের পক্ষে, যেখানে বসপার ঝুলিতে আসে মাত্র ১৫ শতাংশ।

কংগ্রেসের নতুন রণকৌশল ও দলিত নেতৃত্ব:
উত্তরপ্রদেশে নিজেদের হারিয়ে যাওয়া রাজনৈতিক জমি ফিরে পেতে মরিয়া কংগ্রেস এবার জাতভিত্তিক জনগণনা, সংরক্ষণ এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের ইস্যুকে সামনে রেখে এগোচ্ছে। দলের জাতীয় সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে থেকে শুরু করে উত্তরপ্রদেশের রাজ্য স্তরে দলিত নেতৃত্বকে সামনে এনে কংগ্রেস এই বার্তা দিতে চাইছে যে, তারা কেবল নির্বাচনী জোটের দল নয়, বরং সামাজিক ন্যায়ের জাতীয় কণ্ঠস্বর।

তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, বসপার সুদিন গত হলেও মায়াবতীর ঐতিহ্যবাহী জাটভ ভোট ব্যাংক পুরোপুরি নিঃশেষ হয়ে যায়নি। ২০২৪ সালেও ৪৪ শতাংশ জাটভ ভোটার মায়াবতীর পাশেই ছিলেন। তাই কংগ্রেস, সপা কিংবা চন্দ্রশেখর আজাদ— কাউকেই সহজ পথ অতিক্রম করতে হবে না। ২০২৭ সালের লড়াইয়ে মূল প্রতিপাদ্য বিষয় এটাই হবে যে, বসপার ভাঙনের পর ঠিক কোন দিকে মোড় নেবে এই সুবৃহৎ দলিত ভোট ব্যাংক। দলের অন্দরে আকাশ আনন্দের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এবং নতুন প্রজন্মের নেতৃত্ব সংকটের মাঝেই উত্তরপ্রদেশের আগামী বিধানসভা নির্বাচন এক অভাবনীয় রাজনৈতিক লড়াইয়ের সাক্ষী হতে চলেছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *