“সুরাট-মুম্বইকে পেছনে ফেলে শীর্ষে বাংলা!”-পশ্চিমবঙ্গে ছোট ব্যবসার বাড়ছে রমরমা

দেশের অসংগঠিত অ-কৃষি ক্ষেত্রে রেকর্ড গড়ে শীর্ষে উঠে এলো পশ্চিমবঙ্গ। ছোট ব্যবসা, দোকানপাট ও অসংগঠিত সংস্থার সংখ্যা এবং সেখানে কর্মরত মানুষের সংখ্যার নিরিখে গোটা দেশের মধ্যে প্রথম স্থান দখল করেছে রাজ্যের উত্তর ২৪ পরগনা জেলা। পিছিয়ে নেই পাশের দক্ষিণ ২৪ পরগনাও।

কেন্দ্রীয় পরিসংখ্যান ও কর্মসূচি বাস্তবায়ন মন্ত্রকের (MoSPI) সাম্প্রতিক রিপোর্টে এই চমকপ্রদ তথ্য উঠে এসেছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত চালানো ‘ASUSE 2025’ সমীক্ষার ভিত্তিতে জেলাভিত্তিক এই রিপোর্টটি প্রকাশ করা হয়েছে।

উত্তর ২৪ পরগনা ও দক্ষিণ ২৪ পরগনার ছবি

কেন্দ্রীয় তথ্যে স্পষ্ট, উত্তর ২৪ পরগনায় এই ধরনের অসংগঠিত সংস্থার সংখ্যা ১৬.৫৯ লক্ষ, যেখানে সরাসরি কাজ করছেন প্রায় ২১.৩ লক্ষ মানুষ। অন্যদিকে, দক্ষিণ ২৪ পরগনায় অসংগঠিত অ-কৃষি প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ১০.২৯ লক্ষ এবং সেখানে ১২.৪ লক্ষ মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে।

পরিসংখ্যান বলছে, দেশের যেসব জেলায় ৫ লক্ষের বেশি অসংগঠিত প্রতিষ্ঠান রয়েছে, এমন ১৬টি জেলার মধ্যে ৮টি জেলাই আমাদের পশ্চিমবঙ্গের। বাকীদের মধ্যে মহারাষ্ট্রের ৩টি, গুজরাতের ২টি এবং কর্নাটক, তেলঙ্গানা ও উত্তরপ্রদেশের ১টি করে জেলা রয়েছে।

কেন এই তথ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ?

অসংগঠিত অ-কৃষি ক্ষেত্রের মধ্যে মূলত এমন ছোট ব্যবসা, দোকান বা কারখানা পড়ে যেগুলি কোনো বড় কোম্পানি হিসেবে নথিভুক্ত নয়। দেশের এক বিশাল অংশের মানুষের রুটিরুজি তৈরি হয় এই খাতে। ফলে কোনো জেলায় এসব প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেশি থাকা মানেই সেখানকার স্থানীয় অর্থনীতিতে ছোট ব্যবসার গভীর প্রভাব রয়েছে।

তবে এই রিপোর্ট আরও একটি বাস্তবতা সামনে এনেছে। প্রতিষ্ঠান ও কর্মীসংখ্যায় বাংলা সবাইকে টেক্কা দিলেও, প্রতি প্রতিষ্ঠান-পিছু মোট মূল্য সংযোজন বা ‘গ্রস ভ্যালু অ্যাডেড’ (GVA) কিন্তু তুলনামূলকভাবে অনেকটাই কম।

জেলা / অঞ্চল প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা মোট কর্মরত কর্মী প্রতি প্রতিষ্ঠানে গড়ে GVA (বার্ষিক)
উত্তর ২৪ পরগনা (পশ্চিমবঙ্গ) ১৬.৫৯ লক্ষ ২১.৩ লক্ষ ১.৫৯ লক্ষ টাকা
দক্ষিণ ২৪ পরগনা (পশ্চিমবঙ্গ) ১০.২৯ লক্ষ ১২.৪ লক্ষ ১.৬২ লক্ষ টাকা
সুরাট (গুজরাত) ৮.৫১ লক্ষ ১৭.৪ লক্ষ ৪.৩৯ লক্ষ টাকা
সাতারা (মহারাষ্ট্র) ১.৩৩ লক্ষ ২.৪২ লক্ষ ১৫.৭৯ লক্ষ টাকা
মাহে (পুদুচেরি) ২,৮৫৬ ৫,৯২৭ ৫১.৪৭ লক্ষ টাকা

সংখ্যা বিপুল, কিন্তু উৎপাদনশীলতায় কেন পার্থক্য?

অর্থনীতিবিদদের মতে, বাংলায় ছোট ব্যবসা ও কাজের সুযোগের পরিধি বিরাট হলেও প্রতিটি প্রতিষ্ঠান গড়ে অর্থনীতিতে যে অতিরিক্ত আর্থিক মূল্য যোগ করে, তা গুজরাতের সুরাট কিংবা মহারাষ্ট্রের সাতারা জেলার তুলনায় বেশ কম। সহজ কথায়, বাংলায় ব্যবসার সংখ্যা ও কর্মসংস্থান অনেক বেশি হলেও প্রতিটি ছোট প্রতিষ্ঠানের উৎপাদনশীলতা বা মুনাফা তৈরির ক্ষমতা কিছুটা কম।

রিপোর্টে উঠে আসা আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিক

  • নির্দিষ্ট জেলায় প্রভাব: দেশের মোট অসংগঠিত প্রতিষ্ঠানের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ অবস্থান করছে শীর্ষ ৫০টি জেলায়।

  • নারী ক্ষমতায়ন: দেশের অন্তত ২৩৭টি জেলায় এই অসংগঠিত অ-কৃষি ক্ষেত্রে মোট কর্মীর এক-তৃতীয়াংশই মহিলা। ফলে নারীদের কর্মসংস্থানে এই খাতের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

  • প্রথম একক প্রকাশনা: এনএসও (National Statistics Office) জানিয়েছে, এই প্রথম তারা শহরভিত্তিক তথ্যের বাইরে এসে সমগ্র দেশের জেলাভিত্তিক এমন বিস্তৃত রিপোর্ট পেশ করল।

সামগ্রিকভাবে, MoSPI-এর এই রিপোর্ট বুঝিয়ে দিচ্ছে—শুধু প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা দিয়ে অর্থনীতির প্রকৃত শক্তি মাপা সম্ভব নয়। সংখ্যার দিক থেকে পশ্চিমবঙ্গ দেশকে পথ দেখালেও, ছোট ব্যবসাগুলির আয় ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিই এখন সময়ের বড় দাবি।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *