তুলসী দিলেই রেগে যান বাপ্পা! গণেশ চতুর্থীর রাতে ভুলেও চাঁদের দিকে তাকাবেন না, আসল রহস্যটা কী?

গণেশ চতুর্থী মানেই ঘরে ঘরে বিঘ্নহর্তা বাপ্পার মহাসমারোহে আগমন, সুস্বাদু মোদক, লাড্ডুর ভোগ এবং ভক্তিভরে চারদিন ব্যাপী উৎসবের মেজাজ। সনাতন ধর্মে সিদ্ধিদাতা গণেশের আরাধনা ছাড়া যেকোনো মাঙ্গলিক কাজ অসম্পূর্ণ বলে মনে করা হয়। তবে এই পবিত্র উৎসব ঘিরে এমন কিছু কঠোর নিয়ম ও বিধান রয়েছে, যা অনেকেই হয়তো মেনে চলেন, কিন্তু ঠিক কী কারণে এই নিয়মগুলি পালন করা হয়, তা অনেকেরই অজানা। বিশেষ করে, গণেশ পুজোয় তুলসী পাতা নিবেদন করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ এবং গণেশ চতুর্থীর রাতে চাঁদের দিকে তাকানো একপ্রকার অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, এই দুটি নিয়ম অমান্য করলে সংসারে অমঙ্গল ডেকে আনতে পারে। আর এই দুই নিষেধাজ্ঞার নেপথ্যেই লুকিয়ে রয়েছে দুটি রোমাঞ্চকর পৌরাণিক কাহিনি।

১. গণেশ পুজোয় তুলসী পাতা কেন নিষিদ্ধ?
সনাতন ধর্মে প্রায় প্রতিটি দেব-দেবীর আরাধনাতেই তুলসী পাতার উপস্থিতি আবশ্যিক। কিন্তু একমাত্র ভগবান গণেশের পুজোতেই তুলসী পাতা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এর পেছনে রয়েছে পৌরাণিক এক অভিশাপের গল্প।

পৌরাণিক কথামতে, একসময় তুলসী দেবী গঙ্গার তীরে গভীর ধ্যানে মগ্ন ছিলেন। সেই সময় তরুণ বয়সি গণেশ সেদিক দিয়ে যাওয়ার সময় তুলসী দেবী তাঁর অপরূপ রূপ ও তেজে মুগ্ধ হয়ে তাঁকে বিয়ের প্রস্তাব দেন। কিন্তু গণেশ মহারাজ তখন আজীবন ব্রহ্মচারী থাকার ব্রত নিয়েছিলেন, তাই তিনি সেই প্রস্তাব বিনীতভাবে ফিরিয়ে দেন। নিজের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যাত হওয়ায় ক্ষুব্ধ হয়ে তুলসী দেবী গণেশকে অভিশাপ দেন যে, তাঁর ব্রহ্মচর্য একদিন ভঙ্গ হবে এবং তাঁর দুটি বিবাহ হবে।

তুলসীর এমন আচরণে রেগে গিয়ে গণেশও পাল্টা অভিশাপ দেন যে, তুলসী দেবী কখনো দেবী রূপে পূজিতা হবেন না এবং এক অসুরকে তাঁকে বিয়ে করতে হবে, যার নাম হবে শঙ্খচূড়। পরবর্তীতে উভয়েই নিজেদের ভুল বুঝতে পেরে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। তখন গণেশ জানান যে অভিশাপ সম্পূর্ণ খণ্ডন করা সম্ভব নয়, তবে তুলসী গাছ হিসেবে অত্যন্ত পবিত্র বলে বিবেচিত হবেন এবং ভগবান বিষ্ণুর সবচেয়ে প্রিয় হবেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও গণেশের পুজোয় তুলসী পাতা কখনও স্থান পাবে না। সেই থেকে এই প্রথা চলে আসছে।

২. গণেশ চতুর্থীর রাতে চাঁদ দেখা কেন মানা?
দ্বিতীয় এবং অত্যন্ত কৌতূহলোদ্দীপক নিয়মটি হলো গণেশ চতুর্থীর রাতে আকাশের দিকে তাকিয়ে চাঁদ না দেখা। একে শাস্ত্রে ‘মিথ্যা কলঙ্ক’ বা ‘মিথ্যাচার দোষ’ বলা হয়।

এই ঘটনার নেপথ্যেও রয়েছে এক মজার পৌরাণিক গল্প। একবার ভাদ্রপদ মাসের শুক্লপক্ষের চতুর্থীর দিন গণেশজি প্রচুর পরিমাণে মোদক খেয়ে বেহুঁশ হয়ে নিজের ছোট বাহন ইঁদুরের পিঠে চড়ে বাড়ি ফিরছিলেন। অতিরিক্ত ওজনের কারণে ইঁদুরটি হঠাৎ হোঁচট খায় এবং মাটিতে পড়ে যাওয়ায় গণেশের পেট ফেটে সমস্ত মোদক বাইরে বেরিয়ে আসে। এই অবস্থা দেখে গণেশ অত্যন্ত চতুরভাবে সাপ দিয়ে নিজের পেট বেঁধে ফেলেন।

আকাশ থেকে পুরো ঘটনাটি দেখতে পেয়ে চন্দ্রদেব অট্টহাস্যে ফেটে পড়েন এবং গণেশকে উপহাস করেন। চন্দ্রের এমন অহংকারী ও উপহাসমূলক হাসি দেখে ক্রুদ্ধ হয়ে গণেশ তাঁকে অভিশাপ দেন যে, আজকের পর থেকে যে কেউ চন্দ্রের মুখ দেখবে, তার জীবনে নেমে আসবে মিথ্যা অপবাদ এবং সবাই তাকে চোর বলে ভাববে। নিজের ভুল বুঝতে পেরে চন্দ্রদেব ক্ষমা চাইলে গণেশ জানান যে, বছরের অন্যান্য দিন চাঁদ দেখলে কোনো দোষ হবে না, কিন্তু গণেশ চতুর্থীর রাতে চাঁদ দেখলে মিথ্যা কলঙ্ক অবধারিতভাবে লাগবে। সেই কারণেই আজও এই দিনে চাঁদ দেখা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। শাস্ত্রে এও বলা হয়েছে যে, যদি ভুলবশত কেউ এই রাতে চাঁদ দেখে ফেলেন, তবে পবিত্র ‘স্যমন্তক মণির কাহিনি’ শ্রবণ করলে এই দোষ থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *