আদানির গোড্ডা প্ল্যান্টে যান্ত্রিক ত্রুটি! বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সঙ্কটের মাঝে বড় স্বস্তি নিয়ে এল কোন খবর?

ভারতের ঝাড়খণ্ডে অবস্থিত আদানি পাওয়ারের গোড্ডা তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের একটি ইউনিট যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তীব্র বিদ্যুৎ সঙ্কটের মুখে পড়েছিল বাংলাদেশ। যদিও তিন দিন পর ওই ইউনিটটি পুনরায় চালু হওয়ায় কিছুটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছে প্রশাসন। বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যম ‘দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত রবিবার দুপুর ১২টা নাগাদ ইউনিটটি ফের জাতীয় গ্রিডের সঙ্গে সংযুক্ত করা হয় এবং বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সরবরাহ স্বাভাবিক হতে শুরু করে।

কী হয়েছিল গোড্ডা বিদ্যুৎকেন্দ্রে?

‘দ্য ডেইলি স্টার’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার গভীর রাতে গোড্ডা বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিটে বয়লার-সংক্রান্ত গুরুতর সমস্যা দেখা দেয়। এর ফলে রাতারাতি ৮০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার ইউনিটটি বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ। এর ঠিক আগেই কয়লা পরিবহণে জটিলতার কারণে বেশ কিছুদিন কেন্দ্রটির উৎপাদন ব্যাহত হয়েছিল। পরিস্থিতি সবেমাত্র স্বাভাবিক হওয়ার মুখে এই যান্ত্রিক ত্রুটি বড় ধাক্কা দেয়।

‘পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ’-এর তথ্য বলছে, ত্রুটির আগে গোড্ডা কেন্দ্র থেকে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ১,৪০০ মেগাওয়াট ছাড়িয়েছিল। কিন্তু ইউনিট বন্ধ হওয়ায় তা এক ধাক্কায় ৭৫০ মেগাওয়াটের নিচে নেমে যায়। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (BPDB) আশঙ্কা ছিল, মেরামত ও পূর্ণাঙ্গ উৎপাদনে ফিরতে কয়েক দিন সময় লাগবে। তবে নির্ধারিত সময়ের আগেই রবিবার দুপুর ২টার মধ্যে গোড্ডা কেন্দ্র থেকে বাংলাদেশের জাতীয় গ্রিডে মোট বিদ্যুৎ সরবরাহ বেড়ে ১,০৪৬ মেগাওয়াটে পৌঁছয়।

কেন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই গোড্ডা কেন্দ্র?

ভারত থেকে বাংলাদেশ মোট ২,৬৫৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানি করে থাকে। এর মধ্যে প্রায় ১,১৬০ মেগাওয়াট আসে সরকারি ব্যবস্থার মাধ্যমে এবং বাকি ১,৪৯৬ মেগাওয়াট আসে একাই আদানি পাওয়ারের গোড্ডা বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে। ফলে এই কেন্দ্রের উৎপাদন অর্ধেকে নেমে গেলেই বাংলাদেশে বিদ্যুৎ ঘাটতি ভয়াবহ রূপ ধারণ করে।

বাংলাদেশের বিদ্যুৎ সঙ্কটের নেপথ্যে অন্যান্য কারণ

গোড্ডা কেন্দ্রের সাময়িক বিভ্রাট ছাড়াও সামগ্রিক বিদ্যুৎ ব্যবস্থার বেশ কিছু গভীরে সমস্যা রয়েছে। দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ৩০, নামের দিক থেকে ৩০,০০০ মেগাওয়াটের বেশি হলেও সাম্প্রতিক সময়ে উৎপাদন ১৩,০০০ থেকে ১৫,০০০ মেগাওয়াটের মধ্যে আটকে রয়েছে। অথচ দেশের বিদ্যুতের চাহিদা রয়েছে ১৬,০০০ মেগাওয়াটেরও বেশি।

প্রাকৃতিক গ্যাসের তীব্র ঘাটতি: বাংলাদেশের মোট উৎপাদন ক্ষমতার ৪০ শতাংশেরও বেশি গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু চাহিদার তুলনায় গ্যাসের সরবরাহ মারাত্মকভাবে কমে যাওয়ায় উৎপাদন নেমে এসেছে প্রায় ৪,৭০০ থেকে ৫,১০০ মেগাওয়াটে। প্রতিদিন ১০০ কোটি ঘনফুটের বেশি গ্যাসের প্রয়োজন হলেও বর্তমানে সরবরাহ মিলছে মাত্র ৭০ কোটি ঘনফুট।

নেপাল থেকে বিদ্যুৎ আমদানি বন্ধ: হিমালয়-সংলগ্ন এলাকায় আকস্মিক বন্যায় জলবিদ্যুৎ পরিকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় গত ২৮ আগস্ট থেকে নেপাল থেকে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ আমদানি সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে।

পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকারি পদক্ষেপ

গ্যাসের ঘাটতি, কয়লা ও তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলির কারিগরি সমস্যা এবং গোড্ডা কেন্দ্রের সাময়িক বিপর্যয়—সবমিলিয়ে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি অত্যন্ত জটিল হয়ে উঠেছিল। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাংলাদেশ সরকার ইতিমধ্যেই একাধিক কড়া পদক্ষেপ করেছে। গত মাসে শপিং মল ও বাজারগুলি রাত ৮টার মধ্যে বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়। গোড্ডা প্ল্যান্টের বন্ধ ইউনিটটি পুনরায় চালু হওয়ায় সাময়িকভাবে পরিস্থিতি কিছুটা উন্নত হলেও, দেশের সামগ্রিক বিদ্যুৎ ঘাটতি স্থায়ীভাবে মেটাতে গ্যাস ও অন্যান্য জ্বালানির নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *