অস্ত্রোপচার বা কেমো নয়, শুধু ক্যাপসুল খেলেই সারবে ক্যানসার! চিকিৎসা জগতে এল ঐতিহাসিক যুগান্তকারী সাফল্য

চিকিৎসা বিজ্ঞান ও স্বাস্থ্য দুনিয়ায় এক যুগান্তকারী ও ঐতিহাসিক অধ্যায়ের সূচনা হলো। এতদিন স্তন ক্যানসারের নাম মানেই চোখের সামনে ভেসে উঠত ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে চলা জটিল অস্ত্রোপচার, অসহ্য যন্ত্রণাদায়ক কেমোথেরাপি কিংবা রেডিয়োথেরাপির পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার এক ভয়াবহ চিত্র। কিন্তু সেই দিন বদলাতে চলেছে। এবার আর কোনো ইনজেকশন বা সার্জারি নয়, নিছক একটি সাধারণ ক্যাপসুল খেলেই দূর হবে ক্যানসার কোষ! চিকিৎসা বিজ্ঞানের ইতিহাসে এমন অভিনব পদ্ধতির প্রয়োগ আগে কখনও হয়নি, আর এখানেই লুকিয়ে রয়েছে এই আবিষ্কারের আসল নতুনত্ব। স্তন ক্যানসারের চিকিৎসায় এই প্রথম সম্পূর্ণ খাওয়ার ওষুধ আনতে চলেছে বিশ্বখ্যাত ওষুধ নির্মাতা সংস্থা ‘অ্যাস্ট্রাজেনেকা’ (AstraZeneca)। ইতিমধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বা এফডিএ (FDA)-র পক্ষ থেকে এই নতুন ওষুধের ব্যবহারে সবুজ সঙ্কেত দেওয়া হয়েছে। ওষুধটির নাম ‘ট্রুক্যাপ’ বা Truqap (Capivasertib) কম্বিনেশন। এই বিশেষ ক্যাপসুলটি ঠিক কীভাবে কাজ করবে? এতদিন ধরে স্তন ক্যানসার দমনের ক্ষেত্রে কেমোথেরাপি, হরমোন থেরাপি কিংবা সার্জারিই ছিল চিকিৎসকদের একমাত্র ভরসা। কিন্তু অ্যাস্ট্রাজেনেকার এই নতুন ওষুধটি কাজ করবে সম্পূর্ণ ভিন্ন ও আধুনিক পদ্ধতিতে। এটি মূলত একটি ‘টারগেটেড থেরাপি’। স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত অনেক রোগীর শরীরেই PIK3CA, AKT1 এবং PTEN জিনের মিউটেশন বা পরিবর্তন ঘটে, যার ফলে ক্যানসার কোষগুলি অত্যন্ত দ্রুত হারে বিভাজিত হয়ে বাড়তে থাকে। এই ক্যাপসুলটি শরীরে প্রবেশ করার পর সরাসরি সেই নির্দিষ্ট প্রোটিনগুলিকে ব্লক বা নিষ্ক্রিয় করে দেয়। এর জেরে ক্যানসার কোষের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি তো থামেই উল্টে কোষগুলি নিজে থেকেই ধ্বংস হয়ে যায়। এর সঙ্গে ‘ফ্যাসলডেক্স’ বা Faslodex (Fulvestrant) হরমোন থেরাপি যৌথভাবে প্রয়োগ করা হবে। কাদের জন্য এই নতুন ওষুধটি আশীর্বাদস্বরূপ?এফডিএ জানিয়েছে, এই ওষুধটি মূলত তাঁদের জন্যই বিশেষভাবে তৈরি, যাঁরা এইচআর-পজিটিভ (HR-positive), এইচইআর২-নেগেটিভ (HER2-negative) অ্যাডভান্সড স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত এবং যাদের শরীরে নির্দিষ্ট ওই তিনটি জিনের মিউটেশন রয়েছে। পাশাপাশি, অন্যান্য চিকিৎসায় ক্যানসার পুরোপুরি না কমে যাঁদের ক্ষেত্রে রোগ ফের ছড়িয়ে পড়ছে, তাঁদের জন্য এটি অত্যন্ত কার্যকরী। বিভিন্ন ট্রায়ালে দেখা গেছে, এই ওষুধ ক্যানসার ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি প্রায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে দিতে সক্ষম। কেন এই আবিষ্কারকে চিকিৎসা জগতের ‘গেম-চেঞ্জার’ বলা হচ্ছে?১. যন্ত্রণাহীন চিকিৎসা: এতে কোনো ধরনের জটিল সার্জারি বা কাটার ছাঁড়ার ঝক্কি নেই।২. পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নগণ্য: কেমোথেরাপির মতো চুল ঝরে যাওয়া, অতিরিক্ত বমি বা শারীরিক চরম দুর্বলতার মতো কষ্টকর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া এতে অনেক কম।৩. হাসপাতালে ভর্তির ঝামেলা নেই: রোগীকে হাসপাতালে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় কাটাতে হবে না, ঘরে বসেই চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী এই ক্যাপসুল সেবন করা যাবে।৪. সাশ্রয়ী উপায়: আগামী দিনে সাধারণ মানুষের নাগালে চিকিৎসার খরচ অনেকটাই কমিয়ে আনবে এই পদ্ধতি। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মতে, স্তন ক্যানসার যদি প্রথম অবস্থাতেই ধরা পড়ে, তবে তা যথাসম্ভব নির্মূল করা সম্ভব। তবে অনেক সময় সুস্থ হওয়ার পাঁচ-সাত বছর পরেও রোগটি পুনরায় ফিরে আসার ঝুঁকি থেকে যায়, যাকে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় ‘মেটাস্ট্যাটিক ডেভেলপমেন্ট’ বলা হয়। বিজ্ঞানীদের দাবি, ক্যানসার নিরাময়ের পরেও যদি এই ওষুধটি নিয়মমাফিক চালানো হয়, তবে রোগ ফিরে আসার আশঙ্কা অনেকটাই কমে যাবে। এছাড়া যাঁদের পারিবারিক ইতিহাসে স্তন ক্যানসারের নজির রয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রেও এটি প্রতিরোধক হিসেবে কাজ করতে পারে। চিকিৎসা মহলের মতে, স্তন ক্যানসারের চিকিৎসায় এটি এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন করল। যদিও এই মুহূর্তে সমস্ত ধরনের স্তন ক্যানসারের জন্য এটি প্রযোজ্য নয়, তবুও আগামী দিনে গবেষণার পরিধি বাড়লে ক্যাপসুল মাধ্যমেই ক্যানসার নিরাময় অত্যন্ত সহজলভ্য হয়ে উঠবে। খুব শীঘ্রই ভারতের বাজারেও এই ওষুধ চলে আসবে বলে আশা প্রকাশ করেছে প্রস্তুতকারী সংস্থা অ্যাস্ট্রাজেনেকা।