ঘরের কাজ মানেই কি নিখরচায় শ্রম? স্ত্রীকে প্রতি মাসে ‘বেতন’ দিয়ে সমাজকে তাক লাগিয়ে দিলেন সরকারি আধিকারিক!

ভারতীয় সমাজব্যবস্থায় যুগ যুগ ধরে ঘরের কাজকর্ম এবং সংসারের দেখভালকে কেবল স্ত্রীদের অবৈতনিক বা অবশ্যকর্তব্য দায়িত্ব হিসেবেই দেখা হয়ে এসেছে। কিন্তু এই প্রথাগত ধারণাকে এক ঝটকায় বদলে দিয়ে এক অনন্য নজির সৃষ্টি করলেন এক সরকারি আধিকারিক। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম রেড্ডিটে (Reddit) এক যৌথ পরিবারের এই অভিনব আর্থিক ব্যবস্থাপনার কাহিনী ভাইরাল হতেই শুরু হয়েছে তীব্র জল্পনা ও বিতর্ক। অর্থনৈতিক স্বাধীনতা এবং দাম্পত্যে সমান অংশীদারিত্বের সংজ্ঞা নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য হচ্ছেন নেটিজেনরা।
কী রয়েছে ওই ভাইরাল পোস্টে?
রেড্ডিটের ‘TwentiesIndia’ পেজে এক ব্যবহারকারীর পোস্ট ঘিরে এই আলোচনার সূত্রপাত। ওই ব্যক্তি জানান, তাঁর জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা একজন সরকারি কর্মকর্তা। তাঁর স্ত্রী একজন গৃহবধূ, যিনি একা হাতে রান্না থেকে শুরু করে ঘরকন্নার যাবতীয় কাজ সামলান। কিন্তু এই ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় ব্যতিক্রম হলো, ঘরের এই অক্লান্ত পরিশ্রমকে ওই সরকারি অফিসার নিখরচায় বা ‘অটোমেটিক ডিউটি’ বলে মনে করেন না। পরিবর্তে, স্ত্রীর এই শ্রমের পূর্ণ স্বীকৃতি দিয়ে প্রতি মাসে তাঁর হাতে নির্দিষ্ট অঙ্কের একটি আর্থিক স্যালারি তুলে দেন তিনি।
ভাইয়ের যুক্তিকে সমর্থন করে ওই রেডিট ব্যবহারকারী জানান, বাইরে থেকে রান্নার লোক বা কাজের মাসি রাখলে যেমন বাজারদরে তাঁদের বেতন দিতে হয়, তেমনই জীবনসঙ্গী বলেই স্ত্রীর শ্রমের মূল্য শূন্য হতে পারে না।
মালিক-কর্মচারী নয়, আত্মসম্মানের লড়াই:
তবে এই মাসিক অর্থ প্রদানকে স্বামী-স্ত্রীর পবিত্র সম্পর্কের মাঝে কোনো চিরাচরিত বাণিজ্যিক চুক্তি বা মালিক-কর্মচারীর সম্পর্ক হিসেবে দেখা হয় না। সংসারের মুদি বাজার, ইউটিলিটি বিল বা অন্যান্য খরচ ওই স্বামী আলাদাভাবেই বহন করেন। স্ত্রীকে দেওয়া এই নির্দিষ্ট অর্থ সম্পূর্ণ তাঁর নিজস্ব। নিজের ইচ্ছা মতো এই টাকা খরচ করা, সঞ্চয় করা কিংবা নিজের বাবা-মাকে আর্থিক সাহায্য করার ক্ষেত্রেও স্বামীর কোনো অনুমতির প্রয়োজন হয় না। ভারতীয় পরিবারগুলিতে যেখানে গৃহিণীদের হাতখরচের জন্য বা সামান্য হাত খরচার ক্ষেত্রেও স্বামীদের মুখাপেক্ষী হয়ে থাকতে হয়, সেখানে এই ধরনের আর্থিক স্বাধীনতা সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমী বলেই মনে করছেন অনেকে।
নেটিজেনদের মিশ্র প্রতিক্রিয়া:
পোস্টটি ভাইরাল হতেই তা নিয়ে নেটপাড়ায় শুরু হয় জোর চর্চা। নেটিজেনদের একটি বড় অংশ এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়েছেন। তাঁদের মতে, গৃহিণীরা সারাদিন ধরে হাড়ভাঙা খাটুনি খাটলেও সমাজে তার কোনো পেশাগত বা আর্থিক স্বীকৃতি মেলে না। এই ধরনের পদক্ষেপ নারীদের মনে আত্মবিশ্বাস জোগাবে এবং তাঁদের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে।
অন্য এক ব্যবহারকারী মন্তব্য করেন, “সংসারের সমস্ত কাজ করে দিনশেষে বিনা প্রশংসায় বেঁচে থাকার চেয়ে এই ব্যবস্থা অনেক বেশি সম্মানজনক।” আবার অনেকের মতে, বছরের পর বছর ধরে ঘরের কাজকে শ্রমের মর্যাদা না দেওয়াই পুরুষতান্ত্রিক সমাজে একচেটিয়া কর্তৃত্ব তৈরি করেছে। তবে এর পাশাপাশি সমালোচকদের একাংশ প্রশ্ন তুলেছেন, দাম্পত্য সম্পর্ককে কি আদৌ এভাবে বেতনের গণ্ডিতে মাপা উচিত? সবমিলিয়ে, গার্হস্থ্য শ্রমের মূল্যায়ন নিয়ে এই বিতর্ক এখন তুঙ্গে।