‘কোথায় গেল নিষ্পাপ মুখগুলো?’ চোখের সামনে মুহূর্তেই স্কুল চত্বর গ্রাস করল তিব্বতের ভয়ংকর হড়পা বান!

আর পাঁচটা সাধারণ দিনের মতো সকালেই হাসিমুখে স্কুল চত্বরে পা রেখেছিল শত শত শিশু। নেপালের নুয়াকোট জেলার বিদুর পৌরসভার ‘উত্তরগয়া পাবলিক স্কুল’-এ তখন ক্লাসের তোড়জোড়, হস্টেলের প্রাতরাশ কিংবা টিউশন পড়ার চেনা ব্যস্ততা। কিন্তু তিব্বতের দিক থেকে নেমে আসা পাহাড়ি নদীর এক বিধ্বংসী হড়পা বান চোখের পলকে সেই চেনা হাসিখুশি স্কুল প্রাঙ্গণকে নরকে পরিণত করে দিল।

মুহূর্তের আতঙ্ক ও শিক্ষকদের আত্মত্যাগ: চারদিক থেকে ভেসে এল ভয়ের চিৎকার—“বন্যা আসছে, পালাও!” নদীর এই ভয়ংকর ও ফুলেফেঁপে ওঠা রূপ দেখে মুহুর্তের মধ্যে হুড়োহুড়ি পড়ে যায়। পরিস্থিতি বুঝে মুহূর্তমাত্র সময় নষ্ট না করে ছাত্রছাত্রীদের পাহাড়ি জঙ্গল ও উঁচু জায়গার দিকে পালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেন শিক্ষকরা। বড়রা নিজেরা দৌড়ে উপরে উঠলেও, ছোট ছোট পড়ুয়াদের বাঁচাতে আসরে নামেন শিক্ষক-শিক্ষিকারা। কাউকে হাত ধরে টেনে আবার কাউকে কোলে তুলে নিয়ে পাহাড়ের দিকে ছুটতে থাকেন তাঁরা।

যারা সময়মতো উঁচু জঙ্গলে পৌঁছাতে পেরেছিল, তারা প্রাণে বেঁচে গেলেও জলের তীব্র স্রোত এবং গতির কাছে হার মানে বহু শিশু। প্রায় ৩৭০ জন ছাত্রছাত্রীর মধ্যে এখনও পর্যন্ত মাত্র ৪০ শতাংশের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়েছে। ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ শিশুকে পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া গেলেও বাকি নিখোঁজ শিশুদের জন্য হাহাকার পড়ে গেছে চারদিকে।

হৃদয়বিদারক ও অলৌকিক কিছু গল্প: এই বিপর্যয়ের মাঝেও সামনে এসেছে বেশ কিছু মর্মান্তিক ঘটনা। দশম শ্রেণির ছাত্র আয়ুষকে বাঁচাতে সর্বস্ব পণ করে বন্যার দিকে ছুটে গিয়েছিলেন তার বাবা নবরাজ তামাং। কিন্তু স্কুলে পৌঁছনোর আগেই বন্যার আগ্রাসী রূপ তাঁকে কেড়ে নেয়। অন্যদিকে, বাবার এই আত্মত্যাগের কথা না জেনেই শিক্ষকদের নির্দেশে জঙ্গলে পালিয়ে অলৌকিকভাবে বেঁচে যায় আয়ুষ। সুজল লামা, রশ্মী তামাংদের মতো বহু শিশু কাদামাটি মেখে গভীর জঙ্গলে রাত কাটিয়ে প্রাণ বাঁচিয়েছে।

এক লহমার এই আকস্মিক হড়পা বানে ভেসে গেছে বহু স্বপ্ন। যারা ফিরে এসেছে, তাদের চোখের কোণে এখনও জমাট বেঁধে রয়েছে মৃত্যুর আতঙ্ক। আর যাদের সন্তানরা ফেরেনি, সেই পরিবারগুলির বুকফাটা কান্নায় এখন ভারী হয়ে উঠেছে নেপালের পাহাড়ের বাতাস।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *