দিল্লিতে ব্রিকস সম্মেলনেই কি বড় কূটনৈতিক পরীক্ষার মুখে ভারত? ইরান-সংযুক্ত আরব আমিরাতের দ্বন্দ্বে চিন্তায় মোদী সরকার!

বিশ্বমঞ্চে ভারতের মুকুটে আরও এক নতুন পালক যোগ হতে চলেছে। ব্রিকস (BRICS) শীর্ষ সম্মেলন আয়োজনের জন্য রাজধানী দিল্লি এখন পুরোপুরি প্রস্তুত। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেছে যে, আগামী ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লির অত্যাধুনিক ‘ভারত মণ্ডপম’-এ অনুষ্ঠিত হতে চলেছে ১৮তম ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলন। এবারের এই মেগা সামিটে ব্রিকসের স্থায়ী সদস্য দেশগুলির পাশাপাশি বিভিন্ন অংশীদার দেশ এবং ভারতের আমন্ত্রিত অন্যান্য দেশের রাষ্ট্রপ্রধানরাও অংশ নেবেন। ভারত সমস্ত সদস্য দেশকে আমন্ত্রণ জানানোর পর ইতিমধ্যে বেশ কয়েকজন রাষ্ট্রপ্রধান তাঁদের উপস্থিতি নিশ্চিত করেছেন, আর বাকিদের অংশগ্রহণ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
তবে এবারের দিল্লি সম্মেলন কেবল অর্থনৈতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি কিংবা ‘গ্লোবাল সাউথ’-এর কণ্ঠস্বর জোরালো করার গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না। বর্তমান আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে পশ্চিম এশিয়ায় চলমান তীব্র উত্তেজনা এবং বিশেষ করে ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যকার বিপরীত অবস্থান ভারতের সামনে এক বিরাট কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে হাজির হয়েছে।
ইরানের সঙ্গে মুখোমুখি সংযুক্ত আরব আমিরাত: ভারতের বড় মাথাব্যথা
সরকারি সূত্রে খবর, পশ্চিম এশিয়ার বর্তমান সংঘাতময় পরিস্থিতি বিবেচনা করে ভারত চাইছে ব্রিকস ফোরামের ভেতরে যেকোনো সংবেদনশীল ইস্যুতে সর্বসম্মত ঐকমত্যে পৌঁছানো যাক। উল্লেখ্য, ব্রিকসের সমস্ত সিদ্ধান্ত সাধারণত ঐকমত্যের ভিত্তিতেই নেওয়া হয়ে থাকে। ফলে কোনো একটি সদস্য দেশেরও যদি গুরুতর মতবিরোধ থাকে, তবে তা যৌথ বিবৃতি বা প্রস্তাবের ভাষাকে জটিল করে তুলতে পারে।
ইরান এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত—উভয় দেশই ব্রিকসের অপেক্ষাকৃত নতুন সদস্য। মাত্র দু’বছর আগে এই গোষ্ঠীর সম্প্রসারণের সময় তারা এর সঙ্গে যুক্ত হয়। কিন্তু পশ্চিম এশিয়ার চলমান সংকট নিয়ে এই দুই দেশের কৌশলগত স্বার্থ এবং রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি সম্পূর্ণ আলাদা। এর আগে ব্রিকস পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠক সহ একাধিক উচ্চপর্যায়ের সভাতেও তাদের এই অবস্থানের ফারাক স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ফলস্বরূপ, সেপ্টেম্বরের দিল্লি সম্মেলনে পশ্চিম এশিয়ার এই সমীকরণ ভারতের জন্য এক চরম কূটনৈতিক পরীক্ষা হতে চলেছে।
ভারসাম্যের কূটনীতিই ভারতের প্রধান অস্ত্র
এই সংকটময় পরিস্থিতিতে ভারতের অবস্থান শুরু থেকেই অত্যন্ত স্পষ্ট এবং তা বরাবরই সংলাপ ও শান্তির পক্ষে কথা বলে এসেছে। নয়াদিল্লি পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতে জড়িত সমস্ত পক্ষের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ বজায় রেখেছে। সেইসঙ্গে উত্তেজনা প্রশমন এবং আলোচনার টেবিলে সমস্যার সমাধানের ওপর সবথেকে বেশি জোর দিয়েছে মোদী সরকার।
এখন দেখার বিষয়, ঠিক একই ধরনের ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি ভারত ব্রিকস মঞ্চেও সফলভাবে প্রদর্শন করতে পারে কি না। নয়াদিল্লি নিশ্চিতভাবেই চাইবে না যে ব্রিকসের এই প্রভাবশালী মঞ্চটি পারস্পরিক মতপার্থক্যের নতুন আখড়ায় পরিণত হোক। বরং, সদস্য দেশগুলিকে এমন একটি অভিন্ন ভাষা ও দৃষ্টিভঙ্গিতে একমত করা হবে, যা উত্তেজনা হ্রাস, পারস্পরিক সংলাপ বৃদ্ধি এবং আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার বার্তা দেবে।
১১ দেশের বড় পরিবার ও ভারতের চতুর্থ সভাপতিত্ব
উল্লেখ্য, ব্রিকস এখন আর আগের মতো সীমিত কয়েকটি দেশের ছোট কোনো গোষ্ঠী নয়। এর কলেবর অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চিন, দক্ষিণ আফ্রিকা, মিশর, ইথিওপিয়া, ইরান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব এবং ইন্দোনেশিয়া—এই ১১টি দেশ নিয়ে গঠিত হয়েছে ব্রিকস। এর অর্থ দাঁড়ায়, পশ্চিম এশিয়ার একাধিক প্রধান শক্তি আজ একই ছাদের নিচে উপস্থিত। এই বিশাল সম্প্রসারণ যেমন ব্রিকসকে বিশ্বমঞ্চে আরও অনেক বেশি প্রভাবশালী করে তুলেছে, তেমনই এর অভ্যন্তরে ভিন্ন ভিন্ন কৌশলগত স্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখাও বেশ কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে ভারতের সামনে আসল চ্যালেঞ্জ কেবল সফল সম্মেলন আয়োজন করাই নয়, বরং এতগুলি ভিন্নমতের দেশকে একটি অভিন্ন এজেন্ডায় একজোট করা।
চলতি বছর ব্রিকস তার প্রতিষ্ঠার ২০তম বার্ষিকী উদযাপন করছে, যা ভারতের কাছে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ২০২৬ সালে ভারত চতুর্থবারের মতো ব্রিকসের সভাপতিত্ব গ্রহণ করেছে। এর আগে ভারত যথাক্রমে ২০১২, ২০১৬ এবং ২০২১ সালেও সফলভাবে ব্রিকসের সভাপতিত্ব করেছিল। এবছর ভারতের সভাপতিত্বের মূল থিম বা বিষয়বস্তু হলো— ‘স্থিতিস্থাপকতা, উদ্ভাবন, সহযোগিতা এবং স্থায়িত্বের জন্য নির্মাণ’। যা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ‘মানবতা প্রথম’ দর্শনের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ। ভারতের এই সফল সভাপতিত্বের জেরে দেশজুড়ে ২৫টিরও বেশি শহরে ইতিমধ্যেই ৩৫০টিরও বেশি বৈঠক ও উচ্চপর্যায়ের অনুষ্ঠান সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে, যা বিশ্বমঞ্চে ভারতের ক্রমবর্ধমান কূটনৈতিক শক্তিরই প্রমাণ দেয়।